_____ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষক সেই মেরুদণ্ড তৈরির প্রধান কারিগর। একটি আদর্শ সমাজ গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল তথ্য প্রদানকারীর নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শকের। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষক রাজনীতি এবং বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি শিক্ষকদের অন্ধ আনুগত্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। শিক্ষক যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের পতাকাবাহী হন, তখন তিনি আর সর্বজনীন থাকেন না। অথচ একজন ছাত্রের কাছে তার শিক্ষক হওয়ার কথা ছিল পৃথিবীর সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং নির্ভরতার প্রতীক। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস ও নিরাপত্তা। আপনার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ছাত্ররা বিভিন্ন দল ও মতের হতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষক যখন বিশেষ কোনো দলের হয়ে কাজ করেন, তখন ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষার্থীরা তাকে আর ‘আপন’ ভাবতে পারে না।
ভয়ের সংস্কৃতি: শিক্ষক দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হলে শিক্ষার্থীরা তার কাছে মনের কথা বলতে বা ভিন্নমত প্রকাশ করতে ভয় পায়। তাদের মনে এই আশঙ্কা তৈরি হয় যে, শিক্ষকের আদর্শের বাইরে গেলে একাডেমিক মূল্যায়ন বা আচরণে বৈষম্যের শিকার হতে হবে।
আশ্রয়স্থল হারানো: একজন শিক্ষক যখন রাজনীতির মাঠে সরব থাকেন, তখন তিনি তার নৈতিক অভিভাবকত্বের জায়গাটি হারান। ফলে শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষককে নয়, বরং একজন রাজনৈতিক নেতাকে দেখে, যা ছাত্র-শিক্ষকের পবিত্র দূরত্ব ও শ্রদ্ধার জায়গাকে নষ্ট করে দেয়। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল ও বৈশ্বিক মানদণ্ড বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শ থাকে, কিন্তু পেশাগত জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোকে সেখানে অনৈতিক মনে করা হয়।
পেশাগত নিরপেক্ষতা (Professional Neutrality): ফিনল্যান্ড, জাপান বা কানাডার মতো দেশে একজন শিক্ষকের দলীয় পরিচয় ক্যাম্পাসে আনা আইনত ও নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ। সেখানে শিক্ষক কোনো দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণে নিয়োজিত থাকেন।
জার্মানির ‘বোটেলসবাক কনসেনসাস’: ১৯৭৬ সালে প্রণীত এই আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ওপর নিজস্ব মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে পারেন না। যে বিষয়টি সমাজে বিতর্কিত, শ্রেণিকক্ষেও সেটিকে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতে হয়, কোনো একতরফা দলীয় প্রচার সেখানে চলে না।
একাডেমিক ফ্রিডম: অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা গবেষণার খাতিরে রাজনীতি নিয়ে কাজ করলেও, আমাদের দেশের মতো ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তি’ বা প্যানেল ভিত্তিক রাজনীতি সেখানে অনুপস্থিত। সেখানে পদোন্নতি হয় মেধা ও গবেষণার ভিত্তিতে, রাজনৈতিক তদবিরে নয়।
প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়: নিরপেক্ষতার অপরিহার্যতা এই নিরপেক্ষতার প্রয়োজনীয়তা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সমান। প্রাথমিক স্তর: কোমলমতি শিশুদের মনে কোনো রাজনৈতিক বিষবাষ্প প্রবেশ করানো অপরাধের শামিল। এই স্তরের শিক্ষকরা যদি নিরপেক্ষ না হন, তবে শিশুদের মনস্তত্ত্ব শুরুতেই বিভাজিত হয়ে যায়।
উচ্চশিক্ষা স্তর: বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র। এখানে শিক্ষক যদি কোনো দলের আজ্ঞাবহ হন, তবে তিনি স্বাধীনভাবে সত্য বলতে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তার চিরায়ত চরিত্র হারিয়ে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়।
কেন শতভাগ নিরপেক্ষতা প্রয়োজন?
১. বৈষম্যহীন মূল্যায়ন: একজন নিরপেক্ষ শিক্ষকই পারেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীর মেধাকে সঠিক মূল্যায়ন করতে।
২. নিরাপদ আশ্রয়: শিক্ষক যখন রাজনীতির উর্ধ্বে থাকেন, তখন বিপদে-আপদে সকল ছাত্রই তার কাছে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে।
৩. জাতির বিবেক রক্ষা: শিক্ষককে বলা হয় জাতির বিবেক। বিবেক যখন রাজনৈতিক দলের কাছে বন্দি হয়, তখন পুরো জাতি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়, এটি একটি সুমহান ব্রত। শিক্ষকতা পেশায় থাকাকালীন সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা কেবল একটি সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা। শিক্ষক হবেন হিমালয়ের মতো অটল এবং আকাশের মতো উদার, যার ছায়াতলে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান অধিকার ও নিরাপত্তা পাবে। তিনি যে পর্যায়েরই শিক্ষক হোন না কেন—প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চতর গবেষণা—তাকে হতে হবে শতভাগ নিরপেক্ষ। তবেই শিক্ষাঙ্গন হবে বৈষম্যমুক্ত এবং ছাত্ররা পাবে তাদের প্রকৃত নিরাপদ আশ্রয়স্থল!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক