
শাহীন আলম লিটন, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলা সাগরখালী নদী। এক সময় নদীটিতে স্রোত থাকলেও এখন তা প্রায় মরা। এই নদীতেই মায়ের কাছ থেকে সাঁতার শেখা শুরু জুঁইয়ের। অবসর সময়ে সমবয়সীরা যখন খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, তখন পাড়ার কচি কাঁচাদের পেছনে ফেলে সাঁতার কাটতেন জুঁই। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় যোগ দেন স্থানীয় ক্লাবে। বর্গাচাষী বাবার অভাব-অনটনের সংসারেও মেয়ের স্পৃহা ও মায়ের উৎসাহে এগিয়ে চলে তার স্বপ্নযাত্রা। আর আজ সেই নদীপাড়ের জুঁই আক্তার দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দেশসেরা সাঁতারু।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় ঢাকার মিরপুর সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয় “ম্যাক্স গ্রুপ ৩৫তম জাতীয় সাঁতার, ড্রাইভিং ও ওয়াটারপোলো প্রতিযোগিতা-২০২৬”। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হয়ে অংশ নিয়ে ১০টি স্বর্ণ ও ২টি রৌপ্য পদকসহ মোট ১২টি পদক অর্জন করে এককভাবে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন সাগরখালী নদীর কুলের মেয়ে জুঁই আক্তার।
যেভাবে শুরু জুঁইয়ের সাঁতারু হওয়ার পথচলা:
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের নদীর কূল (সাগরখালী নদী) পাড়ার সাইফুল ইসলাম ও বিলকিস খাতুনের ছোট মেয়ে জুঁই আক্তার। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। শুরুতে মায়ের কাছে সাঁতার শেখার পর চতুর্থ শ্রেণীতে আমলা ইউনিয়নের ‘সাগরখালী সুইমিং ক্লাবে’ ভর্তি হন। সেখানকার প্রশিক্ষকদের নজরে আসার পর বিকেএসপিতে সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সাঁতারু হিসেবে যুক্ত আছেন।
মেয়ে হয়ে সাঁতার শেখায় একসময় এলাকার মানুষ নানা কটু কথা বললেও আজ জুঁইয়ের সাফল্যে সবাই গর্বিত। কোচ ও স্থানীয়রা বলছেন, জুঁই এখন এলাকার নতুন প্রজন্মের সাঁতারুদের কাছে এক অনুকরণীয় অনুপ্রেরণা।
সাফ গেমসে দেশের জন্য পদক অর্জনের স্বপ্ন:
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জুঁই আক্তার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সাফ গেমসে বাংলাদেশের বড় কোনো সাফল্য নেই। ২০১৬ সালের পর থেকে সাঁতারে আমরা কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণপদক পাইনি। আমার এখন একমাত্র স্বপ্ন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা হলো সাফ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ভালো ফলাফল করা, যেন দেশের সম্মান বৃদ্ধি পায়।”
অভিভাবক ও প্রশিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া:
জুঁইয়ের মা বিলকিস খাতুন বলেন, “প্রথম দিকে মেয়েকে নিয়ে নিজে ঘাটে যেতাম। আজ তার এই অর্জনে বুকটা গর্বে ভরে গেছে। যারা একসময় কটু কথা বলত, তারা এখন প্রশংসা করে। গ্রামের মেয়েদের জন্য ভালো সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানাই।”
সাগরখালী সুইমিং ক্লাবের প্রশিক্ষক মর্জিনা খাতুন ও সাঁতারের সংগঠক আমিরুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়ার আমলা ইউনিয়ন সাঁতারের উর্বর ভূমি হলেও উপযুক্ত ড্রেসিং রুম, ওয়াশরুম ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। একটু সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে এখান থেকে আরও বিশ্বমানের সাঁতারু তৈরি সম্ভব।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক ও জনপ্রতিনিধিরা জুঁইয়ের এই অসাধারণ সাফল্যে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং কুষ্টিয়ার সাঁতারের উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান জুঁইয়ের এই সাফল্যে গোটা এলাকায় বইছে আনন্দের জোয়ার।#