
সাব্বির আলম বাবু, ভোলা: নদীর বুক চিরে ভেসে আসা শীতল বাতাস, জেলেদের জালে ধরা রূপালি ইলিশের ঝিলিক আর দিগন্তজোড়া সবুজ চরাঞ্চল—সব মিলে শীতের আমেজে এক অপরূপ রূপসী কন্যার মতো সেজেছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দ্বীপ জেলা ভোলা। ‘কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশের দ্বীপের রানী’ খ্যাত ৩,৪০০ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটি এখন দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
ভোলা শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়; এটি নদী, ম্যানগ্রোভ বন, সাগর, ইতিহাস এবং লোকজ সংস্কৃতির এক চমৎকার মিলনভূমি। একদিকে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি, অন্যদিকে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মহাকাব্য—সব মিলিয়ে রূপসী ভোলার সৌন্দর্যের শেষ নেই।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন ‘জ্যাকব টাওয়ার’। ইউরোপের আইফেল টাওয়ারের আদলে নির্মিত ১৬ তলা বিশিষ্ট এই টাওয়ারটি ভোলার পর্যটনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
উচ্চতা ও সক্ষমতা: প্রায় ২২৫ ফুট (৬৮.৫ মিটার) উঁচু এই টাওয়ারটিতে রয়েছে আধুনিক ক্যাপসুল লিফট। প্রতিটি তলায় ৫০ জন এবং একযোগে ৫০০ জন দর্শক অবস্থান করতে পারেন।
উপর থেকে দর্শন: টাওয়ারের শীর্ষে উঠলে একনজরে চোখে পড়ে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, মেঘনা নদী, চারপাশের সবুজ কেওড়া বন এবং সুদূর চর কুকরি-মুকরির ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।
সংলগ্ন আকর্ষণ: টাওয়ারের পাশেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ‘খাসমহল মসজিদ’ এবং সবুজ ঘাসে ঢাকা সুন্দর ‘ফ্যাশন স্কয়ার’।
বঙ্গোপসাগরের কোলে ভোলার শেষ সীমান্তে অবস্থিত প্রায় ৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত চর কুকরি-মুকরি। একে বলা হয় “বাংলাদেশের দ্বিতীয় সুন্দরবন”।
জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী: ঘন কেওড়া ও সুন্দরবনের নানা প্রজাতির গাছে ভরা এই বনে দেখা মেলে চিত্রা হরিণ, বানর, বুনো শুশুক, বানর, শিয়াল ও উদবিড়ালের।
পাখির স্বর্গরাজ্য: শীতে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি অতিথি পাখির আগমন ঘটে এই চরে। বন ও নদীর মোহনায় ট্রলারে ঘুরে বেড়ালে ভাগ্যে থাকলে দেখা মিলতে পারে ডলফিনের খেলা।
চরফ্যাশনের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা তাড়ুয়া দ্বীপ প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়।
লাল কাঁকড়া ও রূপালী বালুচরে হাঁটা: বিস্তীর্ণ সাদা বালুর ওপর হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা করে।
প্রাকৃতিক নির্জনতা: সমুদ্রের ঢেউ আর নোনা বাতাসের পাশাপাশি সৈকতঘেঁষা বনের সরু পথ ধরে হেঁটে চলা পর্যটকদের দারুণ এক অ্যাডভেঞ্চারের অনুভূতি দেয়।
হায়দার আলী জমিদার বাড়ি: প্রাচীন ইতিহাস ও শৈল্পিক স্থাপত্যের এক নীরব সাক্ষী।
ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ: প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন।
শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র: জাতীয় অর্থনীতি ও দেশের জ্বালানি খাতের প্রধান এক চালিকাশক্তি।
ভোলা ভ্রমণের আরেকটি অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এখানকার খাঁটি স্থানীয় খাবার।
চরাঞ্চলের মহিষের কাঁচা দই: কলার পাতায় কিংবা মাটির হাড়িতে জমায়িত ভোলার ঐতিহ্যবাহী মহিষের দই স্বাদে ও পুষ্টিতে অতুলনীয়।
তাজা ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছ: মেঘনা ও সাগরের তাজা রূপালি ইলিশের নানান পদ এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের স্বাদ ভ্রমণকে আরও তৃপ্তিদায়ক করে তোলে।
নদীপথে (সবচেয়ে আরামদায়ক): ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকেলে ও সন্ধ্যায় ভোলার ইলিশা, ভোলা খেয়াঘাট, অথবা চরফ্যাশনের (বেতুয়া) উদ্দেশ্যে বিলাসবহুল একাধিক লঞ্চ ছেড়ে যায়। সকালে পৌঁছানোর পর লোকাল বাস, সিএনজি বা রিজার্ভ গাড়িতে করে বিভিন্ন স্পটে যাওয়া যায়।
সড়কপথে: ঢাকা বা অন্যান্য জেলা থেকে বাসে করে বরিশাল বা লক্ষ্মীপুর হয়ে ফেরি বা স্পিডবোটে মেঘনা পার হয়ে ভোলায় প্রবেশ করা যায়।
ভোলা সদর: ভোলা শহরে বেশ কিছু আধুনিক ও মানসম্মত আবাসিক হোটেল এবং রেস্ট হাউস রয়েছে।
চরফ্যাশন ও কুকরি-মুকরি: জ্যাকব টাওয়ার দেখার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা সদরে ভালো মানের হোটেল ও রেস্ট হাউস রয়েছে। এছাড়া চর কুকরি-মুকরিতে রাত্রিযাপনের জন্য বন বিভাগের রেস্ট হাউস, জেলা পরিষদের ডাকবাংলা ও পরিবেশবান্ধব ইকো-রিসোর্টের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে।#