
সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি:
স্বল্প সময়, কম শ্রম ও নামমাত্র খরচে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ফলন ও বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় দারুণ খুশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের পাট চাষিরা। গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে চলতি মৌসুমে উপজেলাজুড়ে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত প্রায় দেড় মাস ধরে পাটের পরিচর্যা, কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার কৃষকেরা। পাট চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নারীদের পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে বহু বেকার যুবকের।
বিঘায় উৎপাদন ৮-১০ মণ, আয়ে ভাসছেন কৃষকেরা
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস ও স্থানীয় চাষিদের সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার পাটের আঁশ ও পাটকাঠি উভয়েরই ভালো উৎপাদন হয়েছে। বিঘা প্রতি সর্বনিম্ন ৮ মণ থেকে সর্বোচ্চ ১০ মণ পর্যন্ত পাট মিলছে। বাজারে প্রতি মণ পাট মানভেদে ৩,৩৫০ টাকা থেকে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত পাটকাঠির দামও মণ প্রতি ৩০০-৪০০ টাকা।

মনাকষা ইউনিয়নের কৃষক জালাল উদ্দিন জানান, তিনি ১৫ বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ করেছেন প্রায় সোয়া দুই লাখ টাকা। বিপরীতে উৎপাদিত পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে আয় হবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ থাকবে পৌনে তিন লাখ টাকার মতো। একইভাবে জঘলুল হক, হারুণ অর রশিদ, মাসুদ রানাসহ শত শত কৃষক এবার পাট বেচে লাভবান হয়েছেন।
পুঁজি ছাড়াই বেকার যুবকদের ব্যবসায় সফলতা
পাট চাষকে ঘিরে শিবগঞ্জে তৈরি হয়েছে নতুন এক ব্যবসা। জমি থেকে সরাসরি পাটগাছ কিনে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন অনেক বেকার যুবক। পারচৌকার ব্যবসায়ী সাদেক জানান, মাত্র ১৬,৫০০ টাকায় ২৫ কাঠা জমির পাট কিনে ১০ হাজার টাকা প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ শেষে তিনি ৩৫,০০০ টাকায় পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করেছেন। এতে কোনো আগাম ক্যাশ পুঁজি ছাড়াই তার লাভ হয়েছে ৯,০০০ টাকা।
নারীদের কর্মসংস্থান ও বাড়তি আয়
পাটগাছ থেকে আঁশ ছাড়ানোর বিনিময়ে পাটকাঠি নিয়ে শিবগঞ্জের শত শত অসচ্ছল নারী আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করেছেন। বিধবা শিল্পী জানান, প্রতিদিন ৩০-৩৫ আঁটি পাটের আঁশ ছাড়িয়ে তিনি প্রায় ৪০-৪৫ কেজি পাটকাঠি পান। তা বিক্রি করে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে সহজেই সংসার চালাচ্ছেন।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য ও পরিসংখ্যান
শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নয়ন মিয়া জানান, অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকেরা দিন দিন পাট চাষে ঝুঁকছেন।
মোট আবাদি জমি: ২,৩৭৫ হেক্টর (গত বছর ছিল ১,৯১০ হেক্টর)
মোট পাট চাষি: ১১,৮৭৫ জন
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: ৪,১০৩.৭৫ মেট্রিক টন (হেক্টর প্রতি ২.৬৬ মেট্রিক টন)
প্রণোদনা: ৩৫০ জন চাষিকে বিনামূল্যে পাট বীজ, ডিএপি ও এমওপি সার প্রদান করা হয়েছে

পলিথিন নিষিদ্ধ ও সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের দাবি
কৃষকদের আকুল আবেদন—পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন বন্ধ করে পাটের তৈরি ব্যাগ ও ছালার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে শিবগঞ্জে সরকারি পাট ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাজহারুল ইসলাম জানান, কৃষকেরা লিখিত আবেদন করলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করা হবে। এছাড়া পলিথিন ব্যবহার বন্ধে আইন প্রয়োগ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা সামনে আরও জোরদার করা হবে।#