
নাহিদ জামান, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাওয়ার পরও অনেক দস্যু পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
২ সেপ্টেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় খুলনা র্যাব-৬ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সুন্দরবনের পাঁচটি দস্যু বাহিনীর ৫৯ জন সদস্যের যৌথ আত্মসমর্পণের সার্বিক পরিস্থিতি জানাতেই এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
সুন্দরবনের সক্রিয় পাঁচটি বড় বাহিনী থেকে মোট ৫৯ জন দস্যু অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লক্ষ্যে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে ৫২ জনকে ইতোমধ্যেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
বাহিনীভিত্তিক দস্যুদের সংখ্যা:
বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী: ১৬ জন
আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনী: ১৫ জন
আনরুল বাহিনী: ১৩ জন
আফতার বাহিনী: ৮ জন
মিজান বাহিনী: ৭ জন
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, নতুন করে আত্মসমর্পণ করা এই ৫৯ জনের মধ্যে ৮ জন ইতিপূর্বেও আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসিত হওয়ার পরও তারা পুনরায় বনে ফিরে যান এবং দস্যুতা শুরু করেন।
সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে র্যাবের ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের তালিকা:
ওয়ান শুটার গান: ৪৭টি
শটগান: ৪টি
পাইপগান: ৪টি
এয়ারগান: ৩টি
.২২ বোর রাইফেল: ১টি
মোট আগ্নেয়াস্ত্র: ৫৯টি
গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম: ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ এবং ৭টি সক্রিয় ওয়াকিটকি।
র্যাব মহাপরিচালক জানান, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৩১৮ জন দস্যু সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হলো, তাদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন আবারও অপরাধের অন্ধকার জগতে ফিরে গেছেন।
অপরাধে ফেরার প্রধান কারণসমূহ:
সামাজিক চাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি: সমাজে তাদের সহজে মেনে না নেওয়া এবং স্থায়ী জীবিকার অভাব।
আইনি হয়রানির ভয়: অতীতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া অহেতুক মামলা বা গ্রেফতারের আতঙ্ক।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব: স্থানীয় প্রভাবশালী ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপ বা প্ররোচনা।
সচেতনতার ঘাটতি: স্বাভাবিক ও আইনি জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অনাগ্রহ।
“অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কাউকে হয়রানি করা উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক আইনি হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।” — মো. আহসান হাবীব পলাশ, মহাপরিচালক, র্যাব
সুন্দরবনের নিরাপত্তায় র্যাব, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে গত ২ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে ‘অপারেশন রি-স্টার্ট, পিস ইন সুন্দরবন’। বর্তমানে বনে আরও চার থেকে পাঁচটি ছোট-বড় দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে র্যাবের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা:
কার্যকর পুনর্বাসন: অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে সমন্বয় করে নতুন পুনর্বাসন কাঠামোর কাজ চলছে।
গোয়েন্দা নজরদারি: স্বাভাবিক জীবনে ফেরা দস্যুরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।
নতুন র্যাব ব্যাটালিয়ন: বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের ক্যাম্প থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের সুরক্ষায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক একটি ডেডিকেটেড র্যাব ব্যাটালিয়ন গঠনের বিষয়ে সরকারের নিকট প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবিকা এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় র্যাবের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বহাল থাকবে।
চলতি সপ্তাহ থেকেই র্যাবের দিকনির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অংশগ্রহণে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত যৌথ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। অপরাধীদের সঠিক তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।ঢ#