_______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ যে রক্তিম সূর্যের উদয় হয়েছিল, তা ছিল হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত ঘোষণা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী আহ্বান এবং ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্রের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রাপ্তির খতিয়ান যেমন উজ্জ্বল, তেমনি পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা আজও প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতার মূল চেতনা ও প্রত্যাশা স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি সাম্য ও মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল: রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব: নিজের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক মুক্তি: ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি স্বনির্ভর সমাজ। সামাজিক সুবিচার: আইনের চোখে সবার সমান অধিকার এবং শোষণমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। প্রাপ্তির খতিয়ান: অর্জনের উজ্জ্বল দিক বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে:
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ এবং মাথাপিছু আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
অবকাঠামোগত বিপ্লব: পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দেশের যোগাযোগের চিত্র বদলে দিয়েছে। খাদ্য ও স্বাস্থ্য: জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গড় আয়ু বৃদ্ধি ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে দক্ষিণ এশিয়ায় দৃষ্টান্ত স্থাপন।
ডিজিটাল রূপান্তর: তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং তরুণ প্রজন্মের ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে বিশ্বব্যাপী পদচারণা। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও জনআকাঙ্ক্ষা দীর্ঘ সময় পর দেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে, তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের কাছে মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আশা করে।
রাষ্ট্র সংস্কারে বর্তমান সরকারের করণীয়: কিছু পথনির্দেশনা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও নির্বাচন: একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা। সংসদকে সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করা।
২. আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখা যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায়। বিগত সময়ের সকল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
৩. দুর্নীতি দমন ও সুশাসন: ’জিরো টলারেন্স’ নীতিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা। সরকারি কেনাকাটা ও মেগা প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হওয়া।
৫. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: শিক্ষা ব্যবস্থাকে কারিগরি ও কর্মমুখী করা। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা।
উপসংহার স্বাধীনতা কোনো স্থির বিন্দু নয়, এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। প্রাপ্তির আনন্দ আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, আর অপূর্ণতাগুলো আমাদের কর্মতৎপর হতে শেখায়। বর্তমান সরকারের হাত ধরে যদি দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবেই আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণতা পাবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিলেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও আধুনিক ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে পারব। শহীদের রক্ত তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি নাগরিক মাথা উঁচু করে তার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক