
বিশেষ প্রতিবেদক:
দেশের বাজারে আবারও চরম অস্থিরতা তৈরি করে এক লাফেই বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। বিশ্ববাজারের অজুহাত ও সরকারি ক্ষতির দোহাই দিয়ে মধ্যরাতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশের সাধারণ ভোক্তা, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং গণপরিবহন খাত মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামের মাঝে জ্বালানির এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে দেশের বাজারে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি একধাক্কায় ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
| জ্বালানির ধরন | পুরোনো দাম (প্রতি লিটার) | নতুন বর্ধিত দাম (প্রতি লিটার) | মোট বৃদ্ধি (প্রতি লিটার) |
| ডিজেল | ১১৫ টাকা | ১৩৫ টাকা | +২০ টাকা |
| কেরোসিন | ১৩৫ টাকা | ১৫৫ টাকা | +২০ টাকা |
| পেট্রোল | ১৪০ টাকা | ১৬০ টাকা | +২০ টাকা |
| অকটেন | ১৪৫ টাকা | ১৬৫ টাকা | +২০ টাকা |
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বেসরকারি অপারেটররা এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে রান্নাঘর থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন—সবখানেই সাধারণ মানুষকে গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালক ও সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মচারীদের বাকবিতণ্ডার খবর পাওয়া গেছে।
বাজার দর এমনিতেই সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে প্রতিটি সবজির দাম বাড়তি। তার ওপর এলপিজি গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ায় প্রতিটি পরিবারের মাসিক বাজেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকার এক বেসরকারি চাকুরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “বেতন তো বাড়ছে না, কিন্তু প্রতি মাসেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সংসার চালানো এখন অলৌকিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানবাহন চালকদের আয়ের একটি সিংহভাগ চলে যায় তেলের পেছনে। বাস ও ট্রাক চালকদের মতে, লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তাদের দৈনিক ট্রিপপ্রতি আয় তলানিতে ঠেকেছে। মালিক পক্ষ ও চালকদের একাংশ দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন, যা সরাসরি সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেল কেবল একটি একক পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ডিজেল ও পেট্রোলের দাম বাড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব ছড়ায় প্রতিটি উৎপাদনশীল ও সেবা খাতে।
[ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ]
↓
[ পরিবহন ও সেচ খরচ বৃদ্ধি ]
↓
[ নিত্যপণ্যের দাম ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ]
↓
[ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ]
ডিজেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসতেই কনটেইনার ডিপো, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লঞ্চ মালিক সমিতি তাদের ট্রিপ ফি এবং ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। এর ফলে বন্দর থেকে পণ্য সারাদেশে সরবরাহের খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম বড় উপাদান হলো ডিজেল চালিত সেচ পাম্প। ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় আসন্ন মৌসুমে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে কৃষককে বাড়তি সেচ খরচ দিতে হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং বাজারে চালসহ সব ধরণের ফসলের দাম আরও এক ধাপ বাড়বে।
দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাত এবং ভারী শিল্পগুলো এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জেনারেটর পরিচালনায় ডিজেলের বাড়তি দাম পণ্যের ‘কস্ট অব প্রোডাকশন’ বা উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত তার সক্ষমতা হারাতে পারে।
সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (BPC) কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিপিসির দৈনন্দিন লোকসান কমাতেই এই দাম সমন্বয় অপরিহার্য ছিল। বিপিসির দাবি, নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করলে দৈনিক শত কোটি টাকার ওপরে লোকসান হচ্ছিল।
তবে সরকারের এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (CAB) প্রতিনিধিরা।
কর হ্রাসকরণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকারের উচিত ছিল আমদানি পর্যায়ে ট্যাক্স বা ভ্যাট শিথিল করা।
স্বচ্ছতা ও অপচয় রোধ: বিপিসির লোকসান কমানোর জন্য সাধারণ জনগণের পকেট না কেটে প্রশাসনিক অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার বিশ্লেষকরা বেশ কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
ট্যাক্স রিবেট বা ভ্যাট ছাড়: জ্বালানি তেলের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের শুল্ক সাময়িকভাবে প্রত্যাহার বা কমানো।
কৃষকদের বিশেষ ভতুর্কি: সেচ মৌসুমে কৃষকদের সরাসরি জ্বালানি কার্ডের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে ডিজেল সরবরাহ করা।
কঠোর বাজার মনিটরিং: সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা যেন তেলের দোহাই দিয়ে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক না বাড়াতে পারে, তার জন্য টিসিবি ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কঠোর অভিযান জোরদার করা।
ক্রমাগত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর বড় আঘাত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দাবি, অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে জ্বালানির অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা হোক। অন্যথায় এই মূল্যস্ফীতির ধাক্কা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।