
নাজিম হাসান, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় গবাদিপশুর খাবারের চরম ও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন এলাকার প্রান্তিক কৃষক, কৃষাণি এবং বাণিজ্যিক ডেইরি খামারিরা। একদিকে প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব হিসেবে একটানা বৃষ্টি ও বর্ষণ, অন্যদিকে বাজারে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি—এ দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন গবাদিপশু পালনকারীরা। গরুকে ঠিকমতো খাদ্যের জোগান দিতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
বাগমারা উপজেলায় গবাদিপশু চরানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো গো-চারণ ভূমি নেই বললেই চলে। এর ওপর টানা ভারী বর্ষণের ফলে এলাকার অধিকাংশ বড় বড় বিল, খাল-বিল এবং নিম্নাঞ্চল পানিতে টইটুম্বুর হয়ে গেছে। নদীর পাড় ও দাঁড়ার কিনারাগুলো পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, যার ফলে কাঁচা ঘাস কাটার বা গরু বেঁধে চরানোর মতো কোনো শুকনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
স্থানীয়দের মতে, বাগমারায় অপরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে পুকুর খনন করার কারণে দিন দিন পতিত জমির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। ফসলি জমি জলাশয়ে রূপান্তরিত হওয়ায় প্রাকৃতিক ঘাসের উৎস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গো-চারণ ভূমির এই তীব্র অভাবই বর্তমান সংকটকে আরও বেশি ভয়াবহ করে তুলেছে।
[ অঝোর ধারায় বর্ষণ ] ──► [ বিল ও মাঠ প্লাবিত ]
│
[ অপরিকল্পিত পুকুর খনন ] ──► [ পতিত জমি হ্রাস ] ──► [ গো-চারণ ভূমির তীব্র শূন্যতা ]
প্রাকৃতিক ঘাসের বিকল্প হিসেবে খামারিরা বাজার থেকে কেনা খাবারের ওপর নির্ভরশীল হলেও, বাজারে বর্তমানে আগুন দাম। প্রতিটি গো-খাদ্যের দাম বিগত কয়েক মাসের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
| গো-খাদ্যের নাম | পূর্বে বাজারমূল্য (আনুমানিক) | বর্তমান বাজারমূল্য | মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব |
| আউড় (খড়) | ২০০ টাকা (কাড়ি/বোঝা) | ৪০০ – ৫০০ টাকা | ২০০% এর বেশি বৃদ্ধি |
| গম/ধানের ভূষি | স্বাভাবিক দর | অস্বাভাবিক বৃদ্ধি | ক্রয়ক্ষমতার বাইরে |
| খৈল ও খুদ | নিয়মিত দর | আকাশচুম্বী | পশুপালনে অতিরিক্ত খরচ |
| লালি গুড় ও চাউলের গুঁড়ো | সহনশীল দর | রেকর্ড বৃদ্ধি | পুষ্টির জোগান ব্যাহত |
বাজারে খড় বা আউড়ের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আগে যে এক বোঝা আউড় ২০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন স্থানভেদে ৪ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অতিরিক্ত দামে বাইরে থেকে খড় কিনে এনে গরুর চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের খামারিদের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
বাগমারা অঞ্চলের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার বা প্রামীণ নারীরা পারিবারিকভাবে ২/১টি গরু পালন করে বাড়তি উপার্জনের সংস্থান করেন। তবে খাবারের এই অকল্পনীয় দামের কাছে তারা আজ একদম অসহায়।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গৃহস্থ নারী-পুরুষেরা গবাদিপশুর খাবারের সন্ধানে ফসলের মাঠ-ঘাট, রাস্তার পাশে ও বিলের ধারে ছুটোছুটি করছেন। প্রাকৃতিক খাবারের অভাবে বাধ্য হয়ে তারা বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা করছেন:
কচুরিপানা ও লতাপাতা: ডোবা ও বিল থেকে কচুরিপানা ও বিভিন্ন বুনো লতাপাতা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বাঁশের পাতা ও কলাগাছ: গাছের বাঁশপাতা এবং কলাগাছ কেটে তা টুকরো করে গরুর সামনে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
উন্মুক্ত স্থানে বাঁধন: রাস্তার ধার, খেলার মাঠ ও বাড়ির পাশের সাময়িক ফাঁকা জায়গায় গরু বেঁধে রেখে সামান্য ঘাস খাওয়ানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
অপুষ্টিকর ও অপর্যাপ্ত এই বিকল্প খাদ্যের কারণে গবাদিপশুর দুধ উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং পশুগুলো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
“আমরা ২টা গরু দিয়ে সংসার চালাই। কিন্তু খড়ের যে দাম, ভূষির যে দাম—তা কিনে খাওয়ানো আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিলেও পানি, ঘাস কাটার জায়গা নাই। কলাগাছ আর কচুরিপানা দিয়ে কতদিন গরু বাঁচাই রাখা যায়?”
— এক স্থানীয় প্রান্তিক খামারি
বাগমারা উপজেলার এই উদ্ভূত গো-খাদ্য সংকট, খামারিদের ক্ষয়ক্ষতি এবং সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা বা সহায়তা দেওয়া হবে কিনা—এ বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় এবং মোবাইল ফোনে সাড়া না দোয় তার কোনো বক্তব্য বা মতামত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলার হাজার হাজার পশুপালনকারী ও খামারিদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে এই এলাকায় সরকারি উদ্যোগে কম মূল্যে গো-খাদ্য সরবরাহ করা না হলে অনেককেই খামার বন্ধ করে দিতে হবে এবং বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।#