
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামের মূল ভিত্তি এবং মানবজাতির হিদায়াতের একমাত্র আলোকবর্তিকা হলো আল-কুরআন। এই পবিত্র কিতাবকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশে ‘কুরআন মাজিদ’ এবং ‘কুরআন শরীফ’—উভয় পরিভাষাই অত্যন্ত পরিচিত। তবে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে যে, শারয়ী দৃষ্টিতে কোনটি অধিক সঠিক বা কোনোটি ব্যবহার করা নিষেধ কি না। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর একটি গভীর ও তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১. কুরআনে বর্ণিত স্বকীয় নাম ও বিশেষণ মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এই কিতাবকে কোনো একক নামে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গুণবাচক নামে অভিহিত করেছেন। এর মাধ্যমে কিতাবের বহুমুখী মাহাত্ম্য ফুটে ওঠে। আল-কুরআন (পঠিত): “নিশ্চয়ই এটি মহিমান্বিত কুরআন।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৭৭) আল-কিতাব (লিখিত গ্রন্থ): “এটি সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই।” (সূরা বাকারা: ২) আল-ফুরকান (পার্থক্যকারী): “পরম কল্যাণময় তিনি, যিনি তাঁর দাসের প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন…” (সূরা ফুরকান: ১) আয-যিকর (উপদেশ): “নিশ্চয়ই আমি উপদেশ বা যিকর অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।” (সূরা হিজর: ৯)
২. ‘কুরআন মাজিদ’ ব্যবহারের শারয়ী ভিত্তি ‘মাজিদ’ (مجيد) শব্দটি সরাসরি আল-কুরআন থেকেই গৃহীত। এর আভিধানিক অর্থ হলো—মহা-সম্মানিত, সুউচ্চ মর্যাদাশীল এবং বরকতময়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: ”বরং এটি মহিমান্বিত কুরআন (কুরআনুম মাজিদ), যা সংরক্ষিত ফলকে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ।” (সূরা বুরুজ: ২১-২২) যেহেতু আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এই কিতাবকে ‘মাজিদ’ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন, তাই একে ‘কুরআন মাজিদ’ বলা সর্বোত্তম এবং সরাসরি ওহী দ্বারা প্রমাণিত।
৩. ‘কুরআন শরীফ’ ব্যবহারের বিশ্লেষণ ও বৈধতা আমাদের সমাজে ‘কুরআন শরীফ’ শব্দটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। শারয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এর বৈধতা নিচের পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট করা যায়: অর্থগত সামঞ্জস্য: ‘শরীফ’ (شريف) একটি আরবী শব্দ যার অর্থ হলো সম্মানিত। কুরআনে আল্লাহ এই কিতাবকে ‘কারিম’ (সম্মানিত) বলেছেন (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৭৭)। আরবী অভিধান অনুযায়ী ‘কারিম’ ও ‘শরীফ’ সমার্থক। সুতরাং অর্থগতভাবে এটি কুরআনের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। সম্মান প্রদর্শন (তাজিম): ইসলামী ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কুরআনকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য যেকোনো সুন্দর ও মার্জিত বিশেষণ ব্যবহার করা জায়েজ। মুসলিম উম্মাহ শ্রদ্ধা প্রকাশেই এই শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। উলামাদের অভিমত: বিশ্বের অধিকাংশ প্রখ্যাত আলেমগণের মতে, কুরআনকে সম্মানসূচক যেকোনো সুন্দর বিশেষণে ডাকা জায়েজ। তাই ‘কুরআন শরীফ’ বলায় শরীয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
৪. ভাষাতাত্ত্বিক ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য আরব দেশগুলোতে সাধারণত ‘আল-মুসহাফ’ বা সরাসরি ‘আল-কুরআন’ বলা হয়। অন্যদিকে অনারব মুসলিমদের (যেমন: ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও তুরস্ক) মধ্যে কিতাবের প্রতি গভীর আবেগ ও ভক্তি থেকে নামের সাথে ‘শরীফ’ যোগ করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি মূলত ভাষার অলংকার এবং কিতাবের প্রতি মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ।
৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা একে ‘মাজিদ’ বা ‘শরীফ’ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কুরআনের মর্যাদা রক্ষা করা। একে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তিলাওয়াত করা, পবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা এবং এর বিধানসমূহ জীবনে বাস্তবায়ন করাই হলো মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।
উপসংহার: সারসংক্ষেপ হলো, ‘কুরআন মাজিদ’ বলা সরাসরি কুরআন দ্বারা সমর্থিত হওয়ায় এটি অধিকতর উত্তম। তবে ‘কুরআন শরীফ’ বলাও সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে কোনো গুনাহ বা বিভ্রান্তি নেই। দুটি পরিভাষাই ব্যবহার করা যাবে!… তথ্যসূত্র : ১. আল-কুরআন, সূরা আল-বুরুজ, আয়াত: ২১-২২। ২. আল-কুরআন, সূরা আল-ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৭৭। ৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর (মাজিদ শব্দের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে)। ৪. ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (সৌদি আরব স্থায়ী ফতোয়া কমিটি)। ৫. লিসানুল আরব (ইবনুল মানযুর), ‘শারাফা’ ও ‘মাজাদা’ ধাতুর বিশ্লেষণ। #
লেখক একজন শিক্ষক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক।