
জি.এম.আমিনুর রহমান, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি: দীর্ঘ তিন মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মৎস্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ৯০ দিন সুন্দরবনে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার ঘোষণা আসতেই সাতক্ষীরা সহ পুরো উপকূলজুড়ে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ভোরে বন বিভাগের বৈধ পাস (অনুমতিপত্র) নিয়ে হাজার হাজার বনজীবী সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করবেন।
মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রতিবছরের মতো এবারও ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সর্বসাধারণের প্রবেশ ও সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এই তিন মাস বনের ওপর নির্ভরশীল সাতক্ষীরার শ্যামনগর, গাবুরা, পদ্মপুকুর ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকার হাজার হাজার পরিবার সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়ে।
উপকূলীয় এলাকার একাধিক জেলে পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপার্জনের বিকল্প পথ না থাকায় পরিবার চালাতে তাদের চরম হিমশিম খেতে হয়েছে। এনজিও থেকে নেওয়া চড়া সুদের ঋণ ও মহাজনদের দেনা শোধ করাই এখন তাদের মূল উদ্বেগ।
সোরা এলাকার প্রবীণ জেলে জিন্নাত গাজী বলেন: “সুন্দরবন বন্ধ থাকলে আমাদের ঘরে চুলা জ্বলে না। তিন মাস চাল-ডাল কেনার মতো টাকা ছিল না, বাধ্য হয়ে এনজিও ও স্থানীয় মহাজনদের থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছি। ১ তারিখ বন খুললে আবার জলে নামব। এখন মাছ ও কাঁকড়া বেচে ঋণ শোধ করতে পারলে বাঁচি।”
নীলডুমুর গ্রামের জেলে রিপন গাজী জানান: “ধার-দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে দিন গুনেছি কখন বন খুলবে। ১ সেপ্টেম্বর বন খোলার খবরে মনের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এসেছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের কিস্তি মেটানো।”
বন খোলার ক্ষণ গণনার সাথে সাথে সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ, নীলডুমুর ও কৈখালী এলাকার নদীঘাটগুলোতে প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। বনজীবীরা দিন-রাত কাজ করছেন তাদের একমাত্র সম্বল ডিঙ্গি নৌকা ও ট্রলার মেরামত করতে।
ঘাটগুলোর বর্তমান কাজের রূপরেখা:
নৌকা ও ইঞ্জিন মেরামত: দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত থাকা নৌকা ও ট্রলারের তলা রঙ করা এবং ইঞ্জিন প্রস্তুত করা।
জাল সংস্কার: কাঁকড়া ধরার ভাঁড় ও মাছ ধরার ছেঁড়া জাল সেলাই এবং নতুন জাল সাজানো।
পাস সংগ্রহ: বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনসহ স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে পাস ( BLC ) সংগ্রহের লাইন।
পর্যটন প্রস্তুতি: পর্যটন কেন্দ্রগুলোর কটেজ ও বোট মালিকরা ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করছেন দর্শনার্থীদের বরণ করতে।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা এরফান উদ্দীন বলেন, “বনজীবীরা যাতে নিরাপদে বনে প্রবেশ করতে পারেন এবং সহজে পাস গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। একইসাথে সুন্দরবনের পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি থাকবে।”
উপকূলে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে—“জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ”। তবে স্থানীয় জেলেদের মতে, প্রাকৃতির এই ভয়ের চেয়েও বর্তমান সময়ে বনের ভেতরের বড় আতঙ্ক হলো জলদস্যু ও বনদস্যুদের চাঁদাবাজি, হামলা ও অপহরণ।
বনজীবীদের দাবি, বন খুলে দেওয়ার পাশাপাশি বন বিভাগের পাশাপাশি বনের গভীরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা এবং অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি।
| কর্তৃপক্ষ / বাহিনী | দায়িত্ব ও ভূমিকা |
| বন বিভাগ | বৈধ পাস ইস্যু, সীমানা পাহারা ও পরিবেশগত নজরদারি |
| কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশ | জলদস্যু দমন, চাঁদাবাজি রোধ ও নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ |
| মৎস্য বিভাগ | অবৈধ জাল ও বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ রোধে অভিযান |
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সরকারি বনসংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের সাথে মিলে যৌথ নজরদারি চালানো হয়েছে।
একই সুর মিলিয়ে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরা প্রতিরোধে সুন্দরবনে আমাদের টহল টিম সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে।”
জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। কারণ:
মৎস্য প্রজনন: নদী ও খালে মাছ এবং কাঁকড়া ডিম ছাড়ে ও বংশবৃদ্ধি করে।
বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি: হরিণ, বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীদের অবাধ চলাফেরা ও প্রজননের সেরা সময়।
উদ্ভিদের বৃদ্ধি: মানুষের পা না পড়ায় বীজ থেকে নতুন চারা এবং গোলপাতাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে বাড়ে।
মানুষের বিচরণ ও যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ বন্ধ থাকায় এই তিন মাসে সুন্দরবন তার হারিয়ে যাওয়া রূপ ও প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
প্রশ্ন ১: সুন্দরবন কত তারিখ থেকে উন্মুক্ত করা হচ্ছে?
উত্তর: টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন মাছ আহরণ ও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা কেন দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: প্রজনন মৌসুমে বন্যপ্রাণী, মৎস্য সম্পদ এবং সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: সুন্দরবনে প্রবেশের নিয়ম কী?
উত্তর: জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটকদের নির্ধারিত ফি দিয়ে বন বিভাগ থেকে বৈধ পাস বা অনুমতিপত্র নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হয়।