
মোহা: সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমেদ মন্টু সেতু দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া এই সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপজেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার কথা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো বেইলি সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে জরাহঠাৎ বন্ধ পাগলা নদীর সেতুর নির্মাণকাজ—দুর্ভোগে শিবগঞ্জের লাখো মানুষজীর্ণ, সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নতুন সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে মানুষকে সেই পুরোনো সেতু ব্যবহার করতে হচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের অনেক দূর ঘুরে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ উভয়ই বাড়ছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি অধিগ্রহণ, বাড়িঘর উচ্ছেদ, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও তারা এখনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। ফলে প্রশাসন ও জমির মালিকদের মধ্যে জটিলতা কাটছে না।
শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর, দুর্লভপুর, উজিরপুর, পাঁকা ও শ্যামপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য পাগলা নদীর ওপরের এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকার মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে শিবগঞ্জ বাজার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াত করেন।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে পাগলাসহ একাধিক নদী প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সেতু শুধু দুই পাশের রাস্তা যুক্ত করে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবন। একটি ভালো সেতু হলে কৃষক সহজে পণ্য বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়ী দ্রুত মালামাল আনতে পারেন, শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেন এবং জরুরি প্রয়োজনে মানুষ দ্রুত গন্তব্যে যেতে পারেন।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর সেতুটির নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। এরপর ১৫ নভেম্বর ২০২৩ থেকে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্প অনুযায়ী, প্রায় ১৭২ দশমিক ৩০০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বরের মধ্যে। সরবরাহ করা প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৫ টাকা। এত বড় অর্থের একটি প্রকল্পের সঙ্গে এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে। এর আগে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও সেতুটির নির্মাণকাজের ধীরগতি ও বিভিন্ন সমস্যার কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সেতুর দুই পাশে প্রায় ৩৫টি বাড়ি নিয়ে জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
সেতুটির নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জমি অধিগ্রহণ ও বাড়িঘর উচ্ছেদ। সেতুর দুই পাশে অ্যাপ্রোচ সড়কসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে কিছু জমি ও স্থাপনা প্রয়োজন। কিন্তু সেসব জমি এখনো পুরোপুরি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ষা, অতিবৃষ্টি ও বন্যা। নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে পানির প্রবাহ ও নদীর পরিস্থিতি নির্মাণকাজে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সেতুর মাঝের গুরুত্বপূর্ণ পিলারের কাজ বর্ষাকালে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্ষার কারণে মাঝের পিলারের কাজ বন্ধ থাকলেও দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কের কিছু কাজ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় সেই কাজও এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
সেতুর নির্মাণকাজের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি অধিগ্রহণ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত দেখা গেছে। দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. গোলাম আজমের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—যেসব জমির মালিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক নেই, তারা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বেন। অন্যদিকে জমির মালিকদের দাবি, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে এবং তারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। এই মতবিরোধের কারণেই বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সেতুর দুই পাশে যেসব বাড়িঘর উচ্ছেদের আওতায় পড়েছে, তাদের মালিকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুমাইয়া খাতুনের অভিযোগ, তাদের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও জমির মূল্য ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর আলোচনা করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, একটি নোটিশ দেওয়া হলেও এরপর ক্ষতিপূরণ বা জমির মূল্য নিয়ে কার্যকর সমাধান হয়নি। বহু কষ্টে তৈরি করা বসতবাড়ি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ছাড়া ছেড়ে দিতে রাজি নন তারা।
অন্য একজন নোটিশপ্রাপ্ত বাড়ির মালিকও একই ধরনের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, দীর্ঘদিনের কষ্ট ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে তৈরি করা বাড়ির যথাযথ মূল্য না পেলে তারা জায়গা ছাড়বেন না।
এই অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যেমন দ্রুত জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

নতুন সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় পুরোনো বেইলি সেতুটিই এখন মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরোনো এই সেতুটির অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার দশক আগে নির্মিত বেইলি সেতুটি বর্তমানে জরাজীর্ণ ও সরু হয়ে পড়েছে। সেতুর স্টিলের পাটাতন বিভিন্ন সময় পরিবর্তন ও মেরামত করা হলেও পুরো কাঠামোর বয়স ও অতিরিক্ত চাপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আগের প্রতিবেদনেও পুরোনো বেইলি সেতুটির সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা উঠে এসেছে। সেতুর প্রবেশমুখে ইটের পিলার তৈরি করে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে বড় ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহনকে বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে।
দুর্লভপুরের মুদি দোকানি শাহিন আলীর বক্তব্য সমস্যাটির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তার দোকান শিবগঞ্জ বাজার থেকে মাত্র প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে হলেও ট্রাকে করে পণ্য আনতে হলে অনেক সময় প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে কানসাট সেতু দিয়ে যেতে হয়। একজন ব্যবসায়ীর জন্য এটি ছোট কোনো সমস্যা নয়। বেশি দূরত্ব মানে বেশি জ্বালানি খরচ, চালকের অতিরিক্ত সময়, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ। শেষ পর্যন্ত এসব খরচ ব্যবসার ওপর পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদেরও বেশি দাম দিতে হতে পারে। একটি সরাসরি সড়ক যোগাযোগ যখন দীর্ঘ ঘুরপথে পরিণত হয়, তখন এলাকার অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও কম খরচে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
পুরোনো বেইলি সেতু সরু হওয়ায় দুই দিক থেকে যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই জট তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বিভিন্ন সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে।
বিনোদপুর ইউনিয়নের বাকরুলী বিশ্বনাথপুর গ্রামের হারুন অর রশিদের অভিজ্ঞতাও এমন। জরুরি কাজে জেলা শহরে যাওয়ার সময় সেতুর যানজটে আটকে তাকে কিছু পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে বলে তিনি জানান। শেষ পর্যন্ত সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় তার কাজও সম্পন্ন হয়নি। এ ধরনের ঘটনা মানুষের কাছে শুধু বিরক্তিকর নয়, অনেক সময় সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। অফিসের সময় নষ্ট হয়, ব্যবসার কাজ পিছিয়ে যায় এবং জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়।
ছোট যানবাহনের চালকরাও সমস্যায় রয়েছেন। অটো ও মাহিন্দ্রা চালক জসিম ও আব্দুর রশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা জীবিকার জন্য এসব যানবাহন চালান। কিন্তু পুরোনো বেইলি সেতু সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে যানবাহন চালানো কঠিন।
একদিকে পুরোনো সেতুর সমস্যা, অন্যদিকে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ—দুই দিক থেকেই তারা চাপের মধ্যে রয়েছেন। ঠিকমতো যানবাহন চালাতে না পারলে দৈনিক আয় কমে যায়। এর প্রভাব সরাসরি তাদের পরিবারের ওপর পড়ে। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের আয় সাধারণত দৈনিক যাত্রী বা ট্রিপের ওপর নির্ভর করে। যানজট ও দীর্ঘ সময়ের যাতায়াত তাদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে।
সেতুর যানজটের কারণে শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত সমস্যায় পড়ছেন। শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিফাত জানান, সরু এক লেনের সেতুতে দুটি অটোরিকশা পাশাপাশি বা বিপরীত দিক থেকে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে যানজট তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে না। ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পর স্কুলে পৌঁছানো তাদের শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের কয়েক মিনিটের বিলম্বও যদি নিয়মিত হয়, তাহলে সেটি মাস ও বছরের হিসাবে উল্লেখযোগ্য সময়ের ক্ষতিতে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতু নির্মাণের শুরুর দিকে কাজের মান ও নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। এলাকাবাসীর কেউ কেউ অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্মাণকাজে বাধা দিয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। পরবর্তীতে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এরপর আবার নির্মাণকাজ এগোয়। এ ধরনের অভিযোগ কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ সেতুর মতো স্থাপনার ক্ষেত্রে নির্মাণের মান সরাসরি মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। দ্রুত কাজ শেষ করার চেয়ে সঠিক মান বজায় রেখে নিরাপদভাবে কাজ শেষ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. শাহিন আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার মতো গুজব ছড়াচ্ছেন। তার দাবি, বাস্তবে ঠিকাদার পালিয়ে যাননি।
তিনি জানান, বন্যা, বৃষ্টি এবং জমি অধিগ্রহণের সমস্যার কারণেই নির্মাণকাজ আটকে আছে। সেতুর দুই পাশে জমি অধিগ্রহণ এবং বাড়িঘর উচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে নির্মাণকাজ আবার শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ঠিকাদার আব্দুল মান্নানও তার বিরুদ্ধে ওঠা গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, উচ্ছেদ ও জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সমাধান হলে এবং বর্ষা শেষ হলে তারা যথাসময়ে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার চেষ্টা করবেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাহিনুল ইসলাম জানান, বর্ষার কারণে সেতুর গুরুত্বপূর্ণ মাঝের পিলারের কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ সময়ে সেতুর দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কের কিছু কাজ করা সম্ভব ছিল।কিন্তু সেই কাজও করা যাচ্ছে না, কারণ প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ এখনো শেষ হয়নি। সেতুর দুই পাশে জমি অধিগ্রহণ ও বাড়িঘর উচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত উচ্ছেদ সম্পন্ন হবে এবং এরপর সেতুর নির্মাণকাজ আবার এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আশাবাদও তিনি ব্যক্ত করেছেন।
সেতুটির কাজ দ্রুত শেষ করতে হলে প্রথমেই জমি অধিগ্রহণের জটিলতা নিরসন করতে হবে। যেসব জমির মালিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য, তাদের আইন অনুযায়ী দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যাদের কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো দরকার—কোন কাগজ প্রয়োজন, কীভাবে সংশোধন করতে হবে এবং কখন সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। এতে জমির মালিক ও প্রশাসনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি প্রকাশ করা যেতে পারে। কোন অংশ কত শতাংশ শেষ হয়েছে, কোন কাজ বাকি আছে এবং কখন কোন অংশ সম্পন্ন হবে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে স্থানীয় মানুষের আস্থা বাড়বে।
নতুন সেতু চালু না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো বেইলি সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারী যানবাহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যদি প্রকৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি যানজট কমানোর জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা যেতে পারে। ব্যস্ত সময়ে দুই দিকের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা এবং জরুরি যানবাহনের জন্য অগ্রাধিকার ব্যবস্থা নেওয়া হলে কিছুটা হলেও দুর্ভোগ কমতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান হলো নতুন সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন করে নিরাপদভাবে যান চলাচল চালু করা।
সেতুটি সম্পন্ন হলে শিবগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমবে। কৃষকরা সহজে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারবেন। শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা তুলনামূলক দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা, সরকারি সেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে মানুষের সময় বাঁচবে। বিকল্প পথে দীর্ঘ ঘুরপথে যাতায়াতের প্রয়োজন কমে যাবে। একটি ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি এলাকার অর্থনীতিকে অনেকটা রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো সচল রাখে। রাস্তা ও সেতু যত ভালো হবে, মানুষ ও পণ্যের চলাচল তত সহজ হবে। ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয়দের এখন মূল দাবি একটাই—সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি রয়েছে। প্রশাসন ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও নির্মাণকাজের সমস্যাগুলো একে একে সমাধান করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না, মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৩০ কোটি টাকার এই প্রকল্প স্থানীয় মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। তাই কাজটি যেন আর দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমেদ মন্টু সেতু স্থানীয় মানুষের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ, বাড়িঘর উচ্ছেদ, বর্ষা, বন্যা এবং নির্মাণকাজের বিভিন্ন জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত পরিবহন খরচ দিচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারছেন না, চাকরিজীবীরা যানজটে আটকে যাচ্ছেন এবং ছোট যানবাহনের চালকরা ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অন্যদিকে জমির মালিকরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
এ অবস্থায় দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সমাধান করে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর সমন্বয় এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্ধারিত বা সংশোধিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে বলে স্থানীয়রা আশা করছেন। বহুল প্রতীক্ষিত এই সেতু দ্রুত চালু হলে শিবগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
সেতুটির নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমেদ মন্টু সেতু। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭২ দশমিক ৩০০ মিটার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণ, বাড়িঘর উচ্ছেদ, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো বেইলি সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে অনেক পণ্যবাহী যানকে বিকল্প পথে দীর্ঘ দূরত্ব ঘুরে যেতে হচ্ছে।
নতুন সেতু চালু হলে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের সময় ও খরচ কমবে, ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা আরও নিরাপদ ও কার্যকর হবে।
আরও পড়ুন : শিবগঞ্জের পাগলা নদীতে গোসলে নেমে নিখোঁজ যুবকের লাশ উদ্ধার