
# আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা: অধিক ফলন, নামমাত্র উৎপাদন খরচ এবং নতুন কর্মসংস্থানের দারুণ সুযোগ তৈরি করায় সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পুষ্টিকর ও অত্যন্ত সুস্বাদু ‘পানিফল’ চাষ। উপজেলার ছোট-বড় ডোবা, পরিত্যক্ত জলাশয় ও মৎস্য ঘেরগুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে সবুজ পাতার সমারোহে ভরা পানিফলের বিস্তীর্ণ ক্ষেত।
একসময় এই ফল সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে পূর্ণ ধারণা না থাকলেও বর্তমানে স্বাদে ও পুষ্টিগুণে অনন্য হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাহ্যিক বাজারগুলোতেও দেবহাটার পানিফলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ মহাসড়কের দুপাশ, সখিপুর মোড়, ডেল্টা মোড়, গাজিরহাটসহ স্থানীয় প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় হাটবাজার ও ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে পানিফল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে আবার সরাসরি ক্ষেত থেকে ফল তুলে সড়কের ধারে বিক্রি করছেন। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পানিফল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। দাম সাধ্যের মধ্যে থাকায় প্রতিদিন পথচারী ও দূর-দূরান্তের ক্রেতারাও হাত বাড়িয়ে কিনে নিচ্ছেন এই পুষ্টিকর ফল।
সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি এই ফলের আবাদ দেখা গেলেও দেবহাটা উপজেলায় এটি এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। উপজেলার সখিপুর, গাজিরহাট, কামটা, কোঁড়া, দেবহাটা সদর, পারুলিয়া, কুলিয়া এবং বহেরা এলাকায় বিস্তীর্ণ জলাশয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পানিফলের সফল চাষাবাদ করা হচ্ছে।
স্থানীয় অভিজ্ঞ চাষিদের মতে, পানিফল চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এর জন্য কোনো আবাদি জমি নষ্ট করতে হয় না।
উপযোগী স্থান: নিচু জমি, পরিত্যক্ত ডোবা, খানা এবং মৎস্য ঘেরের মিষ্টি কিংবা সামান্য লবণাক্ত উভয় পানিতেই এটি সহজে জন্মায়।
বংশবৃদ্ধি: গাছগুলো কচুরিপানার মতো পানির ওপর ভেসে থাকে। পাতার গোড়া থেকে শিকড়ের মতো ডগা বের হয়ে দ্রুত বংশ বিস্তার করে এবং সেখান থেকেই ফল ধরে।
খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ: অতিরিক্ত কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। সার ও কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা একেবারেই নামমাত্র। তাই অন্যান্য শস্যের তুলনায় উৎপাদন খরচ অনেক কম।
পানিফল চাষ দেবহাটায় বহুমাত্রিক অর্থনীতির সূচনা করেছে।
খুচরা বিক্রেতা: সখিপুর এলাকার খুচরা বিক্রেতা রবিউল ইসলাম জানান, দৈনিক গড়ে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পানিফল বিক্রি করে যা লাভ থাকে, তা দিয়ে পরিবার নিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চলে যাচ্ছে।
পাইকারি ব্যবসায়ী ও দাদন ব্যবস্থা: পাইকারি ব্যবসায়ীরা মৌসুম শুরুর আগেই অর্ধশতাধিক চাষির মাঝে অগ্রিম অর্থ বা দাদন বিনিয়োগ করেন। ফল আসার পর বাজারদরে ফসল সংগ্রহ করে বিভিন্ন জেলায় চড়া দামে বিক্রি করেন। গত এক দশক ধরে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে অনেক পরিবারই আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছে।
দেবহাটা উপজেলা কৃষি অফিসার শওকত ওসমান জানান, “প্রথাগত কৃষিতে পানিফলকে প্রধান শস্য হিসেবে গণ্য করা না হলেও এর উচ্চ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে এটি দ্রুত কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে এর চাষ আশানুরূপভাবে বেড়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে কোনো আলাদা আর্থিক বাজেট না থাকলেও চাষিরা যেন সঠিক উপায়ে ফলন বাড়াতে পারেন, সে জন্য নিয়মিত মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরমর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।#