
বিশেষ প্রতিবেদক: বাংলাদেশে গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়। গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ২,৩৫০ থেকে ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের আশপাশে রয়েছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বিকল্প হিসেবে LPG ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে পরিবারের জ্বালানি ব্যয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ তার তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাসের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
২৮ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছিল, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ঘাটতি ছিল প্রায় ১,৬৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, পরিস্থিতি কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে মোট সরবরাহের পরিমাণই পুরো চিত্র তুলে ধরে না। কারণ সীমিত গ্যাস কোন খাতে কতটা সরবরাহ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য অনেক সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতে শিল্পকারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছে।
ফলে একটি খাতে সংকট কমাতে গিয়ে অন্য খাতে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। এ কারণে গ্যাস সংকটকে শুধু উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে সরবরাহ, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা LNG-এর ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে LNG আমদানি করছে। দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে LNG গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ে। আবার যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে সমস্যা কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে LNG কার্গো সময়মতো পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান সংকটে এসব কারণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে দেশের নিজস্ব উৎস থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া এবং আমদানির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বর্তমানে দেশের মোট চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কূপ খনন এবং পুরোনো কূপ পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎস থেকে ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য নিয়ে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন কূপ খনন করলেই সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস পাওয়া যাবে—এমন নয়। অনুসন্ধান, কূপ খনন, গ্যাসের মজুত যাচাই, উৎপাদন অবকাঠামো এবং পাইপলাইন স্থাপনের মতো বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিক গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর করতে সময় লাগবে।
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করতে বাংলাদেশকে LNG আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই ব্যবস্থা স্বাভাবিক সময়ে কার্যকর হলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অস্থির হলে ঝুঁকি তৈরি হয়।
মহেশখালীতে থাকা ভাসমান LNG টার্মিনালগুলো দেশের গ্যাস সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা LNG পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু টার্মিনালে কোনো কারিগরি সমস্যা হলে কিংবা LNG কার্গো সময়মতো না এলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সংকট তারই একটি উদাহরণ।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের সঙ্গে মহেশখালীর LNG টার্মিনালগুলোর সমস্যা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
একটি LNG টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তাই সেটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সেই ঘাটতি পূরণ করা সহজ হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনাল সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচেও নেমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে দেশের দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
LNG সরবরাহ ব্যবস্থায় শুধু টার্মিনাল সচল থাকলেই হয় না। সময়মতো কার্গো আসা, জাহাজ থেকে LNG খালাস, পুনঃগ্যাসীকরণ এবং পাইপলাইনে সরবরাহ—সব ধাপ ঠিকভাবে কাজ করতে হয়।
সাম্প্রতিক সংকটে টার্মিনাল সমস্যার পাশাপাশি LNG কার্গো আসতেও বিলম্ব হয়েছে। ফলে টার্মিনাল সচল হওয়ার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। কোনো একটি টার্মিনাল বা সরবরাহ পথ সমস্যায় পড়লে যেন পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত না হয়, সে জন্য আরও শক্তিশালী অবকাঠামো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও সব বিদ্যুৎকেন্দ্র সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। কোনো কেন্দ্রের পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে কাগজে থাকা উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে কাজে আসে না।
সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি ও ক্যাপটিভসহ ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট ও ব্যবস্থাপনার কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় প্রভাব হলো লোডশেডিং বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে সারাদেশে লোডশেডিং ৩,৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট।
লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, অনলাইন কাজ, ব্যবসা এবং গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হয় এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এই সমস্যার প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে। সিরামিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
শিল্পকারখানার জন্য শুধু গ্যাসের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ নয়; গ্যাসের চাপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় চাপ না থাকলে অনেক শিল্পযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যায় না।
এর ফলে কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে। এতে ব্যবসার আয় কমে, শ্রমিকদের কাজের ওপর প্রভাব পড়ে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ে।
জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও শিল্পাঞ্চলে একই হারে সরবরাহ বাড়ছে না। সীমিত গ্যাসের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের কারণে শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমে যেতে পারে।
ফলে কারখানাগুলো নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল।
দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এটি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ কোনো বিনিয়োগকারী শিল্পকারখানা স্থাপনের আগে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে চান।
গ্যাস সংকটের প্রভাব সরাসরি পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের ঘরেও। পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার স্বাভাবিকভাবে রান্না করতে পারছে না।
ফলে বিকল্প হিসেবে LPG সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবারের মাসিক জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। সরবরাহ করা তথ্যে পাইপলাইনের গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে বাড়তি খরচে LPG ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সমস্যাটি আরও বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পরিবারগুলোকে চার্জার লাইট, IPS, ব্যাটারি কিংবা জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এসব বাড়তি ব্যয় বিশেষভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ আয় সীমিত থাকায় জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি LNG টার্মিনালের সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণগুলো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
গত কয়েক বছরে LNG, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি নীতির কিছু সিদ্ধান্ত বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করেছে। আবার বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ এবং অতীতের নীতিকে সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে বের হতে হলে শুধু সাময়িকভাবে LNG আমদানি বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সরকার ইতোমধ্যে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপ পুনঃখনন, LNG আমদানি বাড়ানো এবং নতুন LNG টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ।
এছাড়া ভোলা থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকার আগামী কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে। এর লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হতে পারে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে।
একই সঙ্গে LNG অবকাঠামোও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
LNG কার্গো সময়মতো আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও থাকা দরকার। একটি নির্দিষ্ট সরবরাহ পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে আবারও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
গ্যাসের ঘাটতির সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, বিদ্যমান কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো এবং প্রয়োজনে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো গেলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংকট কমানো সম্ভব।
তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল। দীর্ঘদিন এ ধরনের জ্বালানির ওপর নির্ভর করলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে ভবিষ্যতে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকট থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—শুধু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
প্রথমত, বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। LNG টার্মিনাল, গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ত্রুটি যেন দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ করে না দেয়, সে জন্য কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা দরকার।
দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ভোলা ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকায় গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা দ্রুত কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ জরুরি। সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব।
চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে। শিল্প ও আবাসিক খাতে কম জ্বালানি ব্যবহার করে একই পরিমাণ উৎপাদন বা সেবা নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় চাহিদার ওপর চাপ কমবে।
সবশেষে প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যাতে জ্বালানি পরিকল্পনা বারবার বদলে না যায়, এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নীতি।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান, দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা, মহেশখালী টার্মিনালের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, লোডশেডিং, শিল্পকারখানা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট। সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে সারাদেশে লোডশেডিং ৩,৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় এবং ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট।
তাৎক্ষণিকভাবে LNG সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার প্রয়োজন। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, LNG অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই যদি পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়—এটি জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারও সংকেত।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা, যেখানে গ্যাস, LNG, কয়লা, তেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরস্পরের বিকল্প ও পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তাহলেই ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংকট বা কোনো অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষ, শিল্প ও অর্থনীতিকে এত বড় ধাক্কা সামলাতে হবে না।
বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ প্রায় ২,৩৫০ থেকে ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের আশপাশে থাকায় বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা, LNG টার্মিনালে সমস্যা, কার্গো সরবরাহে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়ছে।
কম গ্যাসের চাপ এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সিরামিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, LNG অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো—এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
এই খবর নিয়ে আপনার মতামত কী? [মতামত দিন]