
আরাফাতুজ্জামান,নওগাঁ:-নওগাঁকে প্রস্তাবিত বগুড়া বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করার আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সরকারের এখতিয়ারের বিষয় হলেও, একটি জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, পরিচয়, জনমত এবং বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনোই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।
নওগাঁ বহু দশক ধরে রাজশাহী বিভাগের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দীর্ঘ সময়ে রাজশাহীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নওগাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন। রাজশাহী শুধু একটি বিভাগীয় শহরের নাম নয়; এটি নওগাঁবাসীর পরিচয়, অভ্যাস ও আত্মিক সম্পর্কের অংশ। নওগাঁর মানুষ যখন উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়, সরকারি কাজে যায় কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হয়—তখন রাজশাহীর সঙ্গেই তাদের দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক যোগাযোগ। এই সম্পর্ক একদিনে তৈরি হয়নি; এটি বহু বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নওগাঁ জেলার বড় বড় উপজেলা—বিশেষ করে নিয়ামতপুর, সাপাহার, পোরশাসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে রাজশাহীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের পরিচিত বাস্তবতা।
অনেক স্থানীয় মানুষের মতে, এসব এলাকা থেকে বগুড়ার তুলনায় রাজশাহীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও সামাজিক যোগাযোগই বেশি কার্যকর ও সুবিধাজনক। এমন বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অবশ্যই নতুন বিভাগ গঠনের সম্ভাব্য কিছু ইতিবাচক দিক থাকতে পারে। যদি নতুন বিভাগ গঠনের ফলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ হয়, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন অবকাঠামো তৈরি হয় এবং জনগণ আরও দ্রুত সেবা পায়, তবে সেটি স্বাগতযোগ্য। কিন্তু সেই সম্ভাব্য সুফল অর্জনের জন্য কোনো জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের পরিচয় ও জনমতকে উপেক্ষা করা সমীচীন হবে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মতামতের মূল্যই সর্বোচ্চ। যদি নওগাঁর অধিকাংশ মানুষ রাজশাহী বিভাগেই থাকতে চান, তবে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানোই হবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। প্রশাসনিক সীমারেখা শুধু মানচিত্রের দাগ নয়; এটি মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। আমরা সরকারের কাছে বিনীত আহ্বান জানাই—নওগাঁবাসীর মতামত জানার জন্য গণশুনানি, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা অথবা জনমত জরিপের ব্যবস্থা করা হোক। জনগণের সম্মতি ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
নওগাঁ আজ দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার। এই জেলার মানুষ উন্নয়নের বিরোধী নয়; তারা শুধু চান, তাদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক পরিচয়, বাস্তব সুবিধা এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক যেন অযথা পরিবর্তিত না হয়। নওগাঁ রাজশাহীর ছিল, রাজশাহীর আছে, আর জনগণের ইচ্ছা যদি সেটাই হয়—তবে নওগাঁ রাজশাহী বিভাগেই থাকুক।#