
_____ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ নির্বাচনগুলো সবসময়ই ক্ষমতার পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তবে ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবকটিই সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশেষ করে ‘ইলেক্টরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নির্বাচনী কারচুপির কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে জনমতের বিকৃতি ঘটানোর অভিযোগ বারবার উঠেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।
[১] নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক ও কৌশলগত যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা নিচে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো:
১. প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ: নির্বাচনের ঠিক আগে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রদবদল এবং ক্ষমতাসীন দলের অনুকূলে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (JANIPOP)। [২]
২. কেন্দ্র দখল ও ব্যালট ছিনতাই: ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ ছিল। তবে আধুনিক সময়ে ‘ইলেক্টরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ আরও সূক্ষ্ম রূপ ধারণ করেছে। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) তাদের গবেষণায় ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতেই অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। [৩]
৩. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি: ১৯৯৬ ও ২০০১: কমনওয়েলথ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এই নির্বাচনগুলোকে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কারণ এগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
[৪] ২০১৪: ১৫৪ জন প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং একে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
[৫] ২০১৮ ও ২০২৪: এই দুটি নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘ (UN) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
[৬] তথসূত্র ও রেফারেন্স নিবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ নিচে প্রদান করা হলো: ১. অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, বাংলাদেশ পলিটিক্স: প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুজ (ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড)।
২. জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (JANIPOP), বার্ষিক নির্বাচনী প্রতিবেদন এবং নির্বাচন পরবর্তী মূল্যায়ন রিপোর্ট।
৩. ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB), একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা: গবেষণা প্রতিবেদন (২০১৯)।
৪. কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ (COG), বাংলাদেশ সংসদ নির্বাচন পরবর্তী পর্যবেক্ষক মিশন রিপোর্ট (১৯৯৬, ২০০১)।
৫. ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইলেকশন ফলো-আপ মিশন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের ওপর বিশেষ প্রতিবেদন। ৬. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW), বাংলাদেশ: ক্র্যাকিং ডাউন অন দ্য অপজিশন (নির্বাচনী মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদন, ২০২৪)।
উপসংহার: ইলেক্টরাল ইঞ্জিনিয়ারিং কেবল একটি নির্বাচনকে বিতর্কিত করে না, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট করে যে, একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা অসম্ভব। জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে নির্বাচনী আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি!#
…. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক