__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হয় সেবার মানোন্নয়ন ও প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করা। কিন্তু উন্নয়নের নামে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর যখন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এক শহর থেকে অন্য শহরে স্থানান্তরের তোড়জোড় শুরু হয়, তখন তা কেবল বিস্ময়ের নয়, গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) লিমিটেডের সদর দপ্তর রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের যে তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্ন ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক যৌক্তিকতা কতটুকু আর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ কতটুকু। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। অবাক করার মতো বিষয় হলো, নেসকো স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য গঠিত দুই সদস্যের কমিটিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত না করা এবং তাদের অবগতি না রাখা প্রশাসনিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান যখন তার স্বকীয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন হারায়, তখন তার সেবার মান যে ব্যাহত হবে, তা নিশ্চিত। একদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে বিগত ১৭ বছরে শত শত কোটি টাকার লুটপাট ও ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালন লাইনের মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে কেন দপ্তর স্থানান্তরের মতো ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় কাজে বিদ্যুৎ বিভাগ এতোটা মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা এক বড় প্রশ্ন। উন্নয়ন নাকি আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের বীজ? যদি উন্নয়নই লক্ষ্য হয়, তবে রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত রেশম বোর্ড, পোস্টাল একাডেমী, বিকেএসপি, কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ একাডেমী বা বিএমডিএ-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কোনো ত্রুটি আছে যেগুলোকে স্থানান্তরের চিন্তা করা হচ্ছে না?
উন্নয়ন মানে তো সুষম বণ্টন। খুলনা বিভাগে নেসকো সদৃশ প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানে তো এমন কোনো হঠকারী চিন্তাভাবনা নেই। কোনো জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত প্রভাব বা প্রতিমন্ত্রিত্ব পাওয়ার উত্তেজনায় কোনো শহরকে কেন্দ্র করে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে তা জেলাভিত্তিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। বগুড়া ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সেই বগুড়াকে এমন কোনো বিতর্কের সাথে জড়ানো অনুচিত, যা জেলাটির দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে।

বিকল্প প্রস্তাব: স্থানান্তর নয়, সেবার পরিধি সম্প্রসারণ অনেকেই মনে করছেন, বগুড়া অঞ্চলের মানুষের বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সেবা নিশ্চিত করতে নেসকো-র সদর দপ্তর স্থানান্তর করার কোনো প্রয়োজন নেই। তথ্য-প্রযুক্তির যুগে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় যেখানে আছে, সেখানেই থাকুক। যদি বগুড়াবাসীর সুবিধার কথা বিবেচনা করতেই হয়, তবে বগুড়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আঞ্চলিক বা শাখা কার্যালয়’ খোলা যেতে পারে। এতে যেমন বগুড়ার মানুষ দ্রুত ও কার্যকর সেবা পাবে, তেমনি রাজশাহীতে অবস্থিত মূল দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হবে না। এই মডেলে বর্তমান কার্যালয়ের ওপর চাপ কমবে এবং সামগ্রিক সেবার মান বাড়বে। নতুন করে বিশাল ভবন ও অবকাঠামো তৈরির অর্থ অপচয় না করে শাখা অফিস তৈরি করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।
ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও জনমতের প্রতিফলন বগুড়ার মানুষ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন ধ্বংসাত্মক না হয়। কোনো জেলাকে অন্য কোনো জেলার সাথে তুলনা করে রাজনৈতিক বৈষম্য বা অস্থিরতা তৈরির যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা সচেতন সমাজ কোনোভাবেই সমর্থন করে না। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আগামী নির্বাচনগুলোতে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। জনমনে এই শঙ্কা প্রবল যে, এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সফল হলে কাল হয়তো অন্যান্য বিভাগীয় দপ্তরেও একই চিত্র দেখা যাবে। উন্নয়নের নামে প্রতিষ্ঠানগুলোর এই টানাটানি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিই বিকেন্দ্রীকরণ চায়, তবে ঢাকার যানজট কমাতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান কার্যালয় বা অন্যান্য বড় অধিদপ্তর ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে।
উপসংহার সবশেষে বলতেই হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত জনস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে, কোনো ব্যক্তির আবেগ বা অতি-উৎসাহী প্ররোচনায় নয়। রাজশাহী ও বগুড়া অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, বিরোধ তৈরি হচ্ছে প্রশাসনিক অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। বগুড়াকে ‘ক্লিন, গ্রিন ও পরিকল্পিত’ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে দাবি, তা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মনোযোগ দেওয়া উচিত। সংঘাত বা বৈষম্যের পথ পরিহার করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারা বজায় রাখাই হোক আগামীর অঙ্গীকার। চিন্তক মহল মনে করে, জনরোষ সৃষ্টির আগেই এই সর্বনাশা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের সরে আসা উচিত!#
.. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক