
মো: সফিকুল ইসলাম,সহকারী অধ্যাপক
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার। যেকোনো অঞ্চল বা জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মূলে রয়েছে কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যি সেই জাতীয় ও সামাজিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে?
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গভীরভাবে তাকালে সাফল্যের আলোর পাশে একটি বড় ধরনের অন্ধকার ছায়াও চোখে পড়ে। প্রতি বছর বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে এবং কোনো কোনো বছর পরীক্ষার ফলাফলও বেশ চমকপ্রদ হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার গুণগত ও মানবিক মান কি সেই অনুপাতে বাড়ছে? এই প্রশ্নের সত্য উন্মোচন করতে হলে শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫-এর উজ্জ্বল পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না; নজর দিতে হবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভূমিকা, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীর চারিত্রিক গঠনে।
শিক্ষার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের নিয়মিত ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পরীক্ষানির্ভর উপস্থিতি: অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এখন বিদ্যালয়ে যাওয়া কোনো জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং পরীক্ষার আগে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
শ্রেণিকক্ষের বিকল্প যখন কোচিং: বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও সঠিক পাঠদান না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা দিন দিন প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ পরিবারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রাণহীন ভবন: শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত না যান কিংবা ক্লাসে থেকেও কার্যকর পাঠদান না করেন, তবে কোটি টাকা খরচে নির্মিত সুদৃশ্য ভবন ও চকচকে সাইনবোর্ড কেবল একটি প্রাণহীন কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়।
“শিক্ষার্থী যদি বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা না পেয়ে বাইরে থেকে শিক্ষা ‘কিনতে’ বাধ্য হয়, তবে সেই দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়—প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের।”
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাঙ্গনে নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা সচেতন মহলকে চিন্তিত করে তুলেছে।
ডিআইএ-এর তদন্ত প্রতিবেদন: ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে জেলার অন্তত ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের প্রমাণ মেলে।
স্থানীয় বিতর্ক ও তদন্ত: শিবগঞ্জে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু এবং নাচোলে একটি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে মানববন্ধন ও স্মারকলিপির ঘটনা ঘটেছে।
স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা:
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ বা প্রশাসনিক দুর্নীতি মানে কেবল খাতা-কলমের হিসেব গোলমাল হওয়া নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, খেলাধুলা ও শ্রেণিকক্ষের উন্নয়ন ফান্ডের টাকা অপব্যবহার হলে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তবে, কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী বলা যায় না; নিরপেক্ষ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই কেবল সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হওয়া উচিত।
প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫-এর সংখ্যা নিয়ে উল্লাস দেখা যায়। কিন্তু জিপিএ-৫ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী কি সবসময় সৎ, মানবিক, যুক্তিভিত্তিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে?
আজকের যুগে চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয় একটি বড় সংকট রূপ নিয়েছে:
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার: হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় তথ্যের বন্যা বইছে, কিন্তু ‘তথ্য’ আর ‘শিক্ষা’ এক জিনিস নয়।
সামাজিক ব্যাধি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অশালীন কনটেন্ট আসক্তি, অনলাইন গেমিং, মাদক, কিশোর গ্যাং এবং পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বড়দের আচরণ থেকে শিক্ষা: শিশুরা আমরা তাদের যা বলি তা শেখে না, তারা আমাদের যা করতে দেখে তা শেখে। সমাজের বড়রা যদি নিয়ম ভঙ্গ করা ও দুর্নীতিকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে, তবে নতুন প্রজন্মের কাছে নৈতিকতা প্রত্যাশা করা অর্থহীন।
শিক্ষকতা কেবল ৮টা-৪টার কোনো চাকরি নয়, এটি একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব। শিক্ষকের মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে একজন শিক্ষককে জানতে হবে—তার শিক্ষার্থী কেন ক্লাসে অনুপস্থিত, কেন পড়ার প্রতি মনোযোগ হারাচ্ছে বা কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যদি কেবল নম্বরপত্র ও হাজিরা খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
বর্তমানে অনেক অভিভাবক সন্তানের ‘জিপিএ-৫’ পাওয়াকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি মনে করেন। কিন্তু সন্তান মিথ্যা বলছে কি না, বড়দের সম্মান করছে কি না, মানবিক অনুভূতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রকাশ করছে কি না—সেদিকে নজর দেওয়া সমান জরুরি। ফলাফলের চাপ না দিয়ে সন্তানের চরিত্র গঠনে সময় দেওয়াই অভিভাবকের প্রধান কাজ হওয়া উচিত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও গুণগত মান ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ:
ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা: প্রতিটি স্কুলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের উপস্থিতি বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিচার: প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন তহবিল ও আর্থিক লেনদেনে শতভাগ স্বচ্ছতা আনা। অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্যে তদন্ত করা।
শ্রেণিকক্ষেই সমাধান: স্কুলে পাঠদান নিশ্চিত করে অপ্রয়োজনীয় কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা হ্রাস করা।
সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম: শুধু পড়ালেখা নয়; খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নীতি-নৈতিকতার চর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া।
জিরো টলারেন্স নীতি: দুর্নীতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন কথা যেমন সত্যি নয়, তেমনি সবকিছু চমৎকার চলছে বলাটাও ভুল। এই জেলায় বহু নিষ্ঠাবান শিক্ষক আছেন যারা নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করছেন এবং হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করছে।
তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক সংকট পুরো ব্যবস্থার অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে—ইটের পর ইট গেঁথে সুন্দর ভবন তৈরি করলেই শিক্ষা বড় হয় না, আর ফলাফলের তালিকায় জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়লেই সমাজ শিক্ষিত হয় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—আমরা কি কেবল কাগজের সার্টিফিকেটধারী তৈরি করছি, নাকি প্রকৃত মানুষ তৈরি করছি? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।#