
______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির মুখোমুখি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই যে বীভৎস খবরটি আমাদের তাড়িত করে, তা হলো ধর্ষণ। এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর চরম অবক্ষয়ের ইঙ্গিত। দেশ আজ এমন এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিককালে নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ বছরের শিশুর মায়ের ওপর যে বর্বরোচিত নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। যখন একটি হাসপাতালের মতো সেবামূলক ও নিরাপদ আশ্রয়ে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটে, তখন তা সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে আসে। এই পরিস্থিতিকে অবহেলা করার অর্থ হলো একটি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে সমাজকে ঠেলে দেওয়া।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট ধর্ষণের ঘটনা আজ জাতীয় মহামারীর আকার ধারণ করেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই এই দানবীয় থাবা থেকে নিরাপদ নন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের পর বছর পার হলেও এই অপরাধের গ্রাফ কেবল ঊর্ধ্বমুখী। ধর্ষণের ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার সুযোগ নেই। এটি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ ঘরের বাইরে বের হতেও আতঙ্কিত বোধ করে। নাটোর সদর হাসপাতালের সাম্প্রতিক ঘটনাটি যেভাবে উঠে এসেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে, নিরাপত্তা বেষ্টনীগুলো কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ এবং আইনের শাসনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে বেড়ে ওঠা এক দানবীয় প্রবণতা। এটি করোনা ভাইরাসের চেয়েও ভয়ানক, কারণ ভাইরাসের ভ্যাকসিন থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ধর্ষণের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিষেধক নেই। ধর্ষণের পেছনে বহুমুখী কারণ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই, বরং এটি বহুমুখী সমস্যার ফল। একে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের গভীরে যেতে হবে।
বিচারের দীর্ঘসূত্রতা: মামলা দায়েরের পর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সময় অপরাধীদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। বরং জামিনে বেরিয়ে আসার সুযোগ অপরাধীকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। দীর্ঘস্থায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার প্রায়ই হাল ছেড়ে দেয়, আর অপরাধীরা অর্থের বা প্রভাবের জোরে পার পেয়ে যায়। নৈতিক ও মূল্যবোধের অভাব: আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নৈতিকতার অভাব তরুণ প্রজন্মের একাংশকে বিকৃত মানসিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সঠিক যৌন শিক্ষার অভাব এবং নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানসিকতা গড়ে না ওঠাও এর একটি বড় কারণ।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা: নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার যে আদিম মানসিকতা, তা এখনো সমাজের গভীরে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার দাপট ও প্রতিপত্তি ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতাও এখানে প্রবল। এই মানসিকতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। মাদকের বিস্তার: অপরাধের পেছনে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মাদকাসক্তি। মাদকের সহজলভ্যতা এবং এর প্রভাবে মানুষের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পাওয়া ধর্ষণের মতো অপরাধে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন: আধুনিক জীবনযাত্রার চাপে অনেক সময় অভিভাবকরা সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও আচরণের ওপর পর্যাপ্ত নজর দিতে পারছেন না, যা পরোক্ষভাবে অপরাধ প্রবণতা তৈরিতে সহায়তা করছে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যা: অনেকে ধর্মীয় অনুশাসনের নামে নারীকে গৃহবন্দী রাখার পক্ষে কথা বলেন, যা নারীর গতিশীলতাকে কমিয়ে দেয় এবং নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের অধিকার খর্ব করা হয়, কিন্তু মূল অপরাধী চক্রকে থামানো হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার সংকট নাটোর সদর হাসপাতালের ঘটনাটি একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নজরদারি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা চরমভাবে অবহেলিত। হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে ৩ জন স্টাফ মিলে যদি এই ধরনের অপরাধ করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়? প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের ক্ষেত্রে নৈতিকতা যাচাই বা ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ না করার যে প্রবণতা রয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও মডেল বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণ দমনে কঠোর আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে নারীদের নিরাপত্তায় সিসিটিভি নজরদারি এবং বিচার ব্যবস্থার দ্রুততা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে। অনেক দেশে অপরাধীর নাম ও পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা অপরাধীর ওপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে। আমাদের দেশেও এ ধরনের ডিজিটাল ও আইনি সুরক্ষা মডেলগুলো পর্যালোচনা করে কার্যকর করা প্রয়োজন। উত্তরণের উপায় (প্রতিকার) এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল আবেগতাড়িত প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সুদৃঢ় এবং দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ:
১. দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ধর্ষণ মামলায় ট্রায়াল দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। অপরাধীকে অবিলম্বে শাস্তির আওতায় এনে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে যাতে এটি অন্য সবার জন্য সতর্কবার্তা হয়। ২. পারিবারিক ও শিক্ষামূলক সচেতনতা: ছোটবেলা থেকেই শিশুদের লিঙ্গসমতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে যুক্ত করতে হবে। পরিবার থেকে নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করলে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। ৩. সামাজিক প্রতিরোধ: পাড়ায়-মহল্লায় সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে বা কোনো নারীকে উত্ত্যক্ত করা দেখলে সামাজিকভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। নীরবতা অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়। ৪. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা: হাসপাতাল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি কর্মীর চরিত্রগত সনদ যাচাই এবং নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতে হবে। ৫. মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। ৬. মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং: স্কুল-কলেজে নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করতে হবে যাতে তরুণ প্রজন্ম আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক মূল্যবোধ শিখতে পারে।
উপসংহার ধর্ষণ একটি জাতীয় কলঙ্ক। এটি কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। সরকার ও প্রশাসনকে এই সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে কেবল আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন আনি। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারব। নাটোর সদর হাসপাতালের মতো ঘটনা যেন আর দ্বিতীয়বার না ঘটে, তার জন্য আমাদের প্রতিটি স্তরকে জাগ্রত হতে হবে। এখনই সময়—এই দানবীয় স্রোত থামানোর। এটি শুধু আমার বা আপনার লড়াই নয়, এটি আমাদের আগামীর সুন্দর প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ার লড়াই!#
… ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম সহকারী অধ্যাপক, ইসলাম শিক্ষা ফজর আলী মোল্লা ডিগ্রি কলেজ মুণ্ডুমালা হাট, রাজশাহী। ০১৭১২৫২৫৭৯৮