
বিশেষ প্রতিনিধি, ভোলা: ভোলায় সার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চরম আকারে পৌঁছেছে। জেলায় কৃষিকাজের জন্য সরকার নির্ধারিত মূল্যে বরাদ্দ করা ইউরিয়া ও টিএসপি সার অসাধু চক্রের মাধ্যমে নদীপথে পাচার হয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অসাধু ডিলারদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে একটি বিশাল পাচারকারী চক্র এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছে। এর ফলে ভোলার স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বরাদ্দপ্রাপ্ত ডিলারদের সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ এলাকায় নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র থাকার কথা। তবে ভোলার অধিকাংশ ডিলার তা না মেনে শহরের একটি নামমাত্র দোকানে কাতিব রেখে কার্যক্রম চালান।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) বাফার গুদাম থেকে ডিলাররা নিজেরা সার না তুলে তাদের মনোনীত ‘কথিত প্রতিনিধি’দের পাঠান। এই প্রতিনিধিরা গুদাম থেকে সরাসরি সার ট্রাকে তুলে নিয়ে স্থানীয় বাজারে না দিয়ে বেশি লাভের আশায় কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। আর সেখান থেকেই সার চলে যাচ্ছে পাচারকারীদের হাতে।
গত এক বছরে ভোলা থেকে সার পাচারের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে সড়কপথে সার পাচার করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে সড়কপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে পাচারকারীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। বর্তমানে ভোলার খেয়াঘাট, ইলিশা, এবং চরফ্যাশনের বিভিন্ন নদীঘাট থেকে মাছ ধরার বড় ট্রলার ও বালু বহনকারী বাল্কহেডে করে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী হয়ে মিয়ানমারে সার পাচার করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের গত ৮ মাসে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের পৃথক অভিযানে প্রায় ১৫২ মেট্রিক টন (৩,১৫০ বস্তার বেশি) ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করা হয়েছে এবং জড়িত ১২ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানের চিত্রসমূহ:
কোস্ট গার্ডের তজুমদ্দিন অভিযান: সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বাজারসংলগ্ন মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে ৮ মেট্রিক টন (১৫৯ বস্তা) ইউরিয়া সারসহ একটি পাচারকারী ট্রলার জব্দ করে।
চরফ্যাশনের গভীর রাতের অভিযান (১২ আগস্ট): চরফ্যাশনে গভীর রাতে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে ট্রলার ও ট্রাকে তোলা ২৮৯ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে পুলিশ। ঘটনায় যুক্ত থাকার অপরাধে ৪ জনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়।
ইলিশা ফেরিঘাট অভিযান (৫ মার্চ): ভোলা সদরের খেয়াঘাটের বিসিআইসি বাফার গুদাম থেকে সার তুলে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী ঘাটের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় ৪টি ট্রাকে থাকা ৭১ মেট্রিক টন (১,৪১৮ বস্তা) সারসহ ১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
চর নিজামে জেলেদের প্রতিরোধ: সম্প্রতি চরফ্যাশন ও মনপুরা সীমানার চর নিজামে ৩ হাজার বস্তা সার পাচারের সময় স্থানীয় জেলেরা বাধা দিয়ে পাচারচেষ্টা পণ্ড করে দেন।
| অভিযানের স্থান | জব্দকৃত সারের পরিমাণ | ব্যবহৃত যানবাহন | আটক সংখ্যা |
| তজুমদ্দিন (মেঘনা নদী) | ৮ মেট্রিক টন (১৫৯ বস্তা) | মাছ ধরার ট্রলার | ০ (পালিয়ে যায়) |
| চরফ্যাশন | ১৪.৪ মেট্রিক টন (২৮৯ বস্তা) | ট্রাক ও ট্রলার | ৪ জন |
| ভোলা সদর (ইলিশা ঘাট) | ৭১ মেট্রিক টন (১,৪১৮ বস্তা) | ৪টি ট্রাক ও ফেরি | ১ জন |
| অন্যান্য (মনপুরা ও হাতিয়া) | ৩৭.৯৫ মেট্রিক টন (৭৫৯ বস্তা) | ট্রলার ও বাল্কহেড | ৭ জন |
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কারসাজি ও চোরাচালানের কারণে তারা সঠিক সময়ে নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, “কৃষি কর্মকর্তারা দাবি করছেন সারের কোনো ঘাটতি নেই, অথচ মাঠপর্যায়ে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সিংহভাগ সারই পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কৃষককে। দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।”
সার পাচারের অভিযোগ এবং কৃত্রিম সংকট প্রসঙ্গে ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম মল্লিক জানান, জেলায় কোনো সারের ঘাটতি নেই। সার পাচার রোধে বিসিআইসি গুদাম থেকে সার উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ওপর বিশেষ মনিটরিং নিশ্চিত করা হচ্ছে। অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।#