
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: গণতন্ত্রের আক্ষরিক অর্থ হলো জনগণের শাসন। আর এই শাসনের প্রাণভোমরা হলো পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমত থাকবে, আদর্শিক লড়াই থাকবে এবং থাকবে তপ্ত বাক্যবিনিময়। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে আমরা যে হামলা, পাল্টা হামলা এবং খুনাখুনির চিত্র দেখি, তা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় পড়ে না। রাজনীতি যখন জনসেবা থেকে বিচ্যুত হয়ে পেশিশক্তির মহড়ায় রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধুলোয় মিশে যায়। রাজনৈতিক ভিন্নমত বনাম সহিংসতা গণতন্ত্রে ‘ভিন্নমত’ হলো একটি অলংকার। বিরোধী পক্ষ বা ভিন্ন চিন্তা মানেই শত্রুতা নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মতপার্থক্য মানেই যেন ব্যক্তিগত আক্রোশ। তর্ক-বিতর্ক বনাম গালাগালি: সংসদ বা রাজপথে যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই রাজনীতির সৌন্দর্য। কিন্তু যখন যুক্তির জায়গা গালিগালাজ দখল করে নেয়, তখন রাজনীতির মান ক্ষুণ্ণ হয়।
শান্তিপূর্ণ প্রচারণা বনাম হামলা: নির্বাচনী প্রচারণা হলো ভোটারের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। সেখানে প্রতিপক্ষের মিছিলে হামলা বা কার্যালয় ভাঙচুর কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র ও তথ্যের প্রতিফলন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্যমতে: প্রাণহানি: প্রতি বছর স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শত শত মানুষ আহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা খুনাখুনি পর্যন্ত গড়ায়।
সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি: অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ফলে রাষ্ট্রের তথা জনগণের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়।
ভোটারের অনীহা: সহিংসতার কারণে সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে ভয় পান, যা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তখন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
উত্তরণের পথ: সহনশীলতার রাজনীতি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা: দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের কর্মীদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়।
আইনের শাসন: অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, সংঘাত বা খুনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সংঘাত নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণের জন্য, জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। “অচেনা আয়নার কারিগর” কবিতায় আপনি যেভাবে আত্মপরিচয় ও অন্তরের প্রতিফলনের কথা বলেছেন, রাজনীতিতেও তেমনি নৈতিকতার প্রতিফলন প্রয়োজন। হাতাহাতি, গালাগালি বা খুনাখুনি কখনোই গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের পেশিশক্তির বদলে যুক্তির শক্তিতে বিশ্বাসী হতে হবে। তবেই প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পাবে সাধারণ মানুষ।#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক