
_______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি, শারীরিক সুস্থতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন যে, দেশে আলেম, মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও কেন দুর্নীতি কমছে না। তাঁর এই প্রশ্নটি যৌক্তিক হলেও আংশিক। এর বিপরীতে সমাজচিন্তকদের পাল্টা প্রশ্ন—দেশে এত ডাক্তার ও হাসপাতাল থাকতে কেন রোগব্যাধি বাড়ছে? কেন অসংখ্য রাজনৈতিক নেতার ভিড়েও মানুষের অসহায়ত্ব ঘোচে না? এই নিবন্ধে আমরা দেখার চেষ্টা করব কেন আমাদের এই অবকাঠামোগত প্রাচুর্য গুণগত পরিবর্তনে ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আধিক্য ও নৈতিক সংকট বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখের বেশি মসজিদ এবং কয়েক লক্ষ মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চতর ধর্মীয় ডিগ্রি লাভ করছেন। কিন্তু দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নিম্নমুখী (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী)।
শিক্ষার বিচ্যুতি: ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘তাকওয়া’ বা স্রষ্টভীরুতা অর্জন, যা মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্য অন্যায় থেকে বিরত রাখবে। কিন্তু বর্তমানে এই শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে রুটিনমাফিক পাঠে পরিণত হয়েছে।
বিচ্ছিন্নতা: সমাজের নীতিনির্ধারণী বা পেশাজীবী স্তরের সাথে আলেমদের দূরত্ব এবং কেবল আচার-সর্বস্ব ধর্ম পালনের প্রবণতা সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করার পথে বড় বাধা। চিকিৎসা ব্যবস্থার বিস্তার বনাম স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা গত এক দশকে বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো অসংক্রামক ব্যাধি (Non-communicable diseases) যেমন—ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বাণিজ্যিকীকরণ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে কয়েক হাজার অনুমোদিত হাসপাতাল থাকলেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ দিশেহারা। প্রতিরোধের অভাব: আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা মূলত ‘কিউরেটিভ’ বা নিরাময় নির্ভর, ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক নয়। ফলে হাসপাতাল বাড়লেও সচেতনতার অভাবে রোগব্যাধি কমছে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের অসহায়ত্ব বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪০-এর অধিক এবং মাঠ পর্যায়ে কয়েক লক্ষ সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী রয়েছেন। নির্বাচনের সময় প্রতিটি নেতা জনগণের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দেন। তবুও টিসিবির ট্রাকের পেছনে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে স্বচ্ছতার অভাব একটি রূঢ় বাস্তবতা।
গণতান্ত্রিক ঘাটতি: যখন নেতৃত্ব কেবল দলীয় আনুগত্য বা ক্ষমতার কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের ‘অসহায়ত্ব’ রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হয়।
জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি: রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যদি জনগণের কাছে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠে, তবে নেতার সংখ্যা বাড়লেও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। সমন্বিত বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপট আপনি যে পাল্টা প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা মূলত একটি গভীর সত্যকে নির্দেশ করে: “অবকাঠামো দিয়ে আত্মা পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
১. আলেম: কেবল ওয়াজ মাহফিল দিয়ে নয়, বাস্তব জীবনে সততার উদাহরণ তৈরি করা প্রয়োজন। ২. ডাক্তার: কেবল প্রেসক্রিপশন নয়, রোগীর প্রতি সহমর্মিতা ও চিকিৎসাকে সেবা হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। ৩. নেতা: কেবল স্লোগান নয়, জনদুর্ভোগ লাঘবে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ প্রয়োজন। উপসংহার দোষারোপের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, সমস্যাটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির নয়, বরং এটি একটি জাতীয় নৈতিক সংকট। মসজিদ, হাসপাতাল বা রাজনৈতিক মঞ্চ—এগুলো কেবল কাঠামো মাত্র; এর প্রাণ হলো সততা ও মানবিকতা। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা সংখ্যাতাত্ত্বিক উন্নয়নের চেয়ে গুণগত ও নৈতিক উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছি, ততক্ষণ আলেম বাড়লে দুর্নীতি কমবে না, ডাক্তার বাড়লে রোগ সারবে না এবং নেতা বাড়লে দারিদ্র্য ঘুচবে না। একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রতিটি পক্ষকে স্ব-স্ব স্থানে আমানতদারিতা বা সততার প্রমাণ দিতে হবে!..#
# লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক