
মোহা. সফিকুল ইসলাম | শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে কিছুতেই থামছে না সারের জন্য কৃষকদের চরম আকুতি ও হাহাকার। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও চড়া দামে সার বিক্রির চাপে নাভিশ্বাস উঠছে স্থানীয় চাষীদের। রবি মৌসুমে ভুট্টা ও সরিষার জমি প্রস্তুত করেও উপযুক্ত সময়ে ডিএপি (DAP) ও অন্যান্য সার না পাওয়ায় বীজ বপন করতে পারছেন না কৃষকরা। অন্যদিকে, কৃষি দপ্তরের দাবি—উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই, কিছু কৃষকের আগাম সার মজুদ রাখার প্রবণতাই এ কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিনব্যাপী উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর, শ্যামপুর, দাইপুখুরিয়া ও কানসাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের তীব্র ক্ষোভ ও দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।
মনাকষা ইউনিয়নের ঈদগাহ মোড়ে সার কিনতে আসা সুফিয়া বেগম নামে এক নারী জানান, দুই বিঘা জমিতে ভুট্টা ও সরিষা বপনের জন্য জমি প্রস্তুত করলেও সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পাননি। ৮৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ নজরুল ইসলাম আকুতি জানিয়ে বলেন, “শেষ বয়সে এক বস্তা ডিএপি সারের জন্য রাত ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখন বলা হচ্ছে সার নেই।”
একই দৃশ্য দেখা গেছে মনাকষা বাজারের অগ্রণী ব্যাংকের নিচে আকবর মিয়ার গুদামের সামনে। সেখানে ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় এক হাজার কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভোর ৪টা থেকে দাঁড়িয়ে থাকা মাসিদুর রহমান ও সুমন জানান, ১০ থেকে ২০ বিঘা জমিতে আবাদের জন্য সারের তীব্র প্রয়োজন হলেও কোনো সার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। ম্যানেজারদের যোগসাজশে দালালদের মাধ্যমে শুরুতেই ১০-১২ বস্তা করে সার গোপনে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া চড়া দামে ২১০০ টাকায় চোরাই পথে বস্তাপ্রতি সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
ঘটনাস্থলে কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে ডিলারদের অনুপস্থিতিতে কৃষকদের মাঝে চরম মারমুখী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি রবি মৌসুমে শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন শস্যের আবাদ হচ্ছে।
সার সংকট ও অভিযোগের বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নয়ন মিয়া বলেন, “উপজেলায় সারের কোনো আসল সংকট বা সিন্ডিকেট নেই। চাহিদা মোতাবেক পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। শুধু নভেম্বর মাসের জন্যই ১২৭৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৫০ মেট্রিক টন এমএপি, ২০৪ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, অবৈধভাবে সার বিক্রি ও কৃত্রিম সংকট রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত দুই মাসে ৭-৮টি অভিযানে প্রায় সোয়া তিন লাখ টাকা মূল্যের দুই শতাধিক বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে, ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দ্রুত কৃষি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হলে এই বিশৃঙ্খলা কেটে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।#