
জুবায়ের আলম,রাজশাহী: বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজশাহীর এক তহশীলদারের সরকারি রেজিস্ট্রার খাতার পাতা ছিঁড়ে ফেলার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংবাদ প্রকাশিত হবার পর-ই সংশ্লিষ্ট তহশীলদার সাইফুলকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি নথি নষ্ট করার মতো গুরুতর অভিযোগের ঘটনায় কেন তাঁকে বিভাগীয় ব্যবস্থা, কৈফিয়ত তলব বা শাস্তির আওতায় না এনে কেবল বদলি করা হলো?
এ নিয়ে রাজশাহীতে নানা গুঞ্জন চলছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এর পেছনে কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে, নাকি কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপ বা অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে? যদিও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, বোয়ালিয়া ভূমি অফিসে একটি আবেদনের বিষয়ে যথাযথ শুনানি ছাড়াই একতরফা সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অপর পক্ষ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে তিনি রায় স্থগিত করেন। পরে প্রথম পক্ষ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে সেখান থেকেও পূর্বের আদেশ স্থগিত রেখে আগামী ৭ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মামলা বিচারাধীন এবং আদেশ স্থগিত থাকা অবস্থায় তহশীলদার সাইফুল সংশ্লিষ্ট হোল্ডিং পুনরায় চালু করে দেন।
এ সময় সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি আবার হোল্ডিং বন্ধ করে দেন এবং তিনটি সরকারি রেজিস্ট্রার বইয়ের নির্দেশনাসংবলিত পাতা ছিঁড়ে ফেলেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তহশীলদার সাইফুল দাবি করেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশে ওই কাজ করেছেন। তবে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান এমন কোনো মৌখিক নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে সংবাদ প্রকাশ ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই সাইফুলকে বদলি করা হয়।
এদিকে, মামলার ভুক্তভোগী মোছা. রেখা অভিযোগ করে বলেন, মৃত সুজাউদ্দৌলার ওয়ারিশ আসাদুল্লাহ দিং বোয়ালিয়া থানার সপুরা মৌজায় তাঁদের ৩৭ কাঠা জমির খারিজ বাতিল এবং একই জমিসহ আরও কিছু জমি নিজেদের নামে খারিজের দাবিতে বড়কুঠি সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে ৭৪/১৩/২০২৪-২৫ নম্বর মিস কেস দায়ের করেন। রেখার দাবি, তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ সরকার তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই গত বছরের ২১ মে, তার শেষ কর্মদিবসে একতরফাভাবে তার নামের খারিজ বাতিল করেন। তবে প্রতিপক্ষের নামেও খারিজ মঞ্জুর করা হয়নি। তার ভাষ্য, প্রতিপক্ষের নামে সংশ্লিষ্ট জমির কোনো বৈধ দলিল নেই, তাই তাদের এ ধরনের আবেদন করার আইনগত ভিত্তিও নেই।
তিনি আরও জানান, ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ১২ মার্চ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) উভয় পক্ষের খাজনা খারিজ বাতিল করে জমিগুলো আরএস মূল হোল্ডিংয়ে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদেশে উল্লেখ করা হয়, জমিগুলো নিয়ে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে প্রতিপক্ষ অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে তিনি গত ৬ মে পূর্বের আদেশ স্থগিত রেখে ৭ জুলাই শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। কিন্তু শুনানির আগেই প্রভাবশালীদের সহায়তায় প্রতিপক্ষ পুনরায় তাদের খারিজ চালু করে নেয় বলে অভিযোগ করেন রেখা।
রেখার অভিযোগ, প্রতিপক্ষ যেসব দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করছে, সেগুলোতে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন মামলায় তারা ২০টি দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা দাবি করলেও কোথাও নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেনি কোন জমি কোন দলিলের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপস্থাপিত দলিলগুলোর মধ্যে কিছু আমমোক্তারনামা এবং কিছু সাফকবলা দলিল রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আমমোক্তারনামা গুলোতে সব মালিক দাতা হিসেবে উপস্থিত নেই, পণমূল্যের উল্লেখ নেই, দাতা-গ্রহীতা উভয়েই বর্তমানে মৃত এবং এসব দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি আইনসম্মত নয়। একইভাবে সাফকবলা দলিলগুলোর ক্ষেত্রেও প্রকৃত মালিক ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে দাতা হিসেবে দেখানোসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এছাড়া একই সম্পত্তি একবার বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে অর্জনের পর পুনরায় আমমোক্তারনামার মাধ্যমে মালিকানা দাবি, কিছু জমির ক্ষেত্রে কোনো মালিকানার দলিল ছাড়াই মালিকানা দাবি এবং দখলে রাখার চেষ্টার অভিযোগও করেন তিনি।#