
# হামিদুর রহমান,তানোর (রাজশাহী)প্রতিনিধি : রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক মৃত গৃহবধূর কান থেকে স্বর্ণের দুল (রিং) খুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের এক মালির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি হাসপাতালজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগের পর হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মালি রায়হান আলী কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ ঘটনায় নিহত গৃহবধূর ভাই মিঠুন বাদী হয়ে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে তানোর উপজেলার তালন্দ ইউনিয়নের সুখদেবপুর গ্রামের মনোয়ার হোসেনের স্ত্রী, তিন সন্তানের জননী লিপি বেগম (৪২) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বজনরা দ্রুত তাকে অটোভ্যানে করে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করলেও একপর্যায়ে লিপি বেগম মারা যান। মৃত্যুর পর তার মরদেহ জরুরি বিভাগের বেডে রাখা হয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছিল। মরদেহের কান থেকে স্বর্ণের দুল উধাও অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় হাসপাতালের মালি রায়হান আলী মরদেহের কাছে গিয়ে লিপি বেগমের কানে থাকা স্বর্ণের দুল খুলে নেন। পরবর্তীতে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা দেখতে পান, মৃতের কানে থাকা স্বর্ণের দুল নেই। বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তারা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন এবং রায়হান আলীর প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে পুরো ঘটনা বুধবার সকালে দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর নিহতের স্বজনরা হাসপাতালে এসে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুটেজ পরীক্ষা করলে সেখানে অভিযুক্ত মালি রায়হান আলীকে মরদেহের কান থেকে স্বর্ণের দুল খুলে নিতে দেখা যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফুটেজ দেখার পর স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. জোবাইদা রহমান বলেন,”রোগীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রোগীর মৃত্যুর পর ছাড়পত্রের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। সেই সুযোগে মালি রায়হান আলী মরদেহের কান থেকে স্বর্ণের দুল খুলে নেয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তিনি আরও জানান, রায়হান আলী নিজেকে রোগীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে জোরপূর্বক জরুরি বিভাগের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। তাকে কয়েকবার বেরিয়ে যেতে বলা হলেও তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরে রাতেই খবর আসে যে মৃত রোগীর কানের স্বর্ণের দুল নেই। এরপর থেকেই অভিযুক্ত কর্মচারী আর হাসপাতালে আসেননি।
অভিযুক্ত মালি রায়হান আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়টি ধরা পড়েছে জানানো হলে তিনি বলেন, “আমি কানের দুল খুলে একজন মহিলার হাতে দিয়েছি। তবে ওই মহিলার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাকে চেনেন না বলে দাবি করেন। সিসিটিভি ফুটেজে সেই মহিলার কাছে দুল হস্তান্তরের দৃশ্য না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বারনাবাস হাসদাক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,”ঘটনাটি তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত মালি রায়হান আলীকে দায়িত্ব পালন থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী, নিহতের স্বজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তার মরদেহের নিরাপত্তাও যদি নিশ্চিত না হয়, তবে এটি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।#