
সাব্বির আলম বাবু, ভোলা: ভোলা জেলা শহরসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক। কোনো ধরনের ফিটনেস সনদ, ট্রাফিক নিয়মনীতি কিংবা চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ছাড়াই এসব যান চলাচল করায় জেলার সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা একপ্রকার ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। শহরের প্রধান সড়ক, ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ পথচারী, শিক্ষার্থী, রোগী ও প্রতিদিনের কর্মজীবী মানুষ।
ভোলা শহর ও পুরো জেলাজুড়ে ঠিক কত সংখ্যক ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করছে, তার কোনো সমন্বিত ও আপডেট (হালনাগাদ) তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে বৈধ ও অবৈধ অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এক ধরণের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
পৌরসভার বক্তব্য: ভোলা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দিকে পৌরসভা থেকে প্রায় ১,২০০টি অটোরিকশার অনুকূলে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে নতুন করে কোনো অটোরিকশাকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে সড়কে যেসব নতুন অটোরিকশা নামছে, তার সবই অনুমোদনহীন। তবে অবৈধ অটোরিকশার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পৌরসভার জানা নেই।
শোরুম ও কারখানা অনুমোদন: ভোলা পৌরসভার লাইসেন্স শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইসেন্স ইন্সপেক্টর মো. রাকিব জানান, শহরে ইজিবাইকের শোরুম ও তৈরির কারখানা মিলিয়ে মোট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পৌর লাইসেন্স রয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান বিনা লাইসেন্সে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো শোরুম বা কারখানার ট্রেড লাইসেন্স থাকা মানেই সেখান থেকে বিক্রি বা তৈরি হওয়া অটোরিকশার সড়কে চলাচলের বৈধতা থাকা নয়। অটোরিকশা ব্যক্তিগতভাবে নিবন্ধিত ও অনুমোদিত হতে হয়।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত পার্কিং স্পেস থাকার পরও চালকরা দ্রুত যাত্রী পাওয়ার আশায় রাস্তার ওপর গাড়ি থামিয়ে রাখেন, যা যানজটের প্রধান কারণ। অবৈধ অটোরিকশা প্রস্তুতকারী কারখানার বিরুদ্ধে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।
অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং চলন্ত রাস্তায় হঠাৎ মোড় পরিবর্তন বা যাত্রী নামানোর কারণে ভোলায় সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৩ মাসে ভোলায় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন নিহত এবং ৫ জন আহত হয়েছেন।
যদিও সব দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে ইজিবাইককে দায়ী করা যাবে না—সড়কের অবস্থা, পথচারীদের অসচেতনতা ও অন্যান্য যানবাহনের গতিও এর জন্য দায়ী—তবুও অটোরিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ভোলা জেলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই আজিজুল করিম জানান, শহরের ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক বিভাগ কাজ করছে। গত জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই ৩ মাসে যত্রতত্র পার্কিং ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে প্রায় ৯০টি অটোরিকশাকে জরিমানা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, ইজিবাইক ও অটোরিকশার সৃষ্টি করা যানজট নিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ভোলা পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পৌরসভা ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এসব যানবাহন নির্ধারিত স্ট্যান্ডে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে এবং যানজট নিরসন সহজ হবে।
ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
পশ্চিমঞ্চল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ জানান:
অটোরিকশা চার্জিংয়ের জন্য ভোলা শহরে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত প্রায় ২৫টি মিটার বা সংযোগ রয়েছে।
প্রতিটি সংযোগে প্রায় ১০ কিলোওয়াট করে লোড অনুমোদিত আছে।
পূর্বে যেখানে অটোরিকশা চার্জে প্রায় ২০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ কিলোওয়াটে (অর্থাৎ প্রায় অর্ধ মেগাওয়াট)।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমানে বার্ষিক বিদ্যুৎ খরচের সঠিক ইউনিট হিসেব এখনো প্রক্রিয়াধীন। এর পাশাপাশি অনেক গ্যারেজে অনুমোদিত লোডের অতিরিক্ত কিংবা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত কঠোর তদারকির দাবি উঠেছে। অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করছে না, বরং অতিরিক্ত লোডের কারণে শর্ট সার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।#