
নিজস্ব প্রতিবেদক , ঢাকা: বাংলাদেশে সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিতভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চক্রান্তের মাধ্যমে ভাষার মূল রূপ বদলে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে যত চক্রান্তই হোক না কেন, এ দেশের মানুষের ভেতরেই যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের ক্ষমতা রয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির সংকট: স্বরূপ সন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে পরিকল্পিতভাবে কিছু নতুন শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত ও ব্যবহৃত শব্দগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন রূপ চাপিয়ে দেওয়াটা সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতারই অংশ। ‘খুন’, ‘রক্ত’ কিংবা ‘লাশ’-এর মতো সুপ্রতিষ্ঠিত শব্দগুলোর বদলে অন্য শব্দ বসানোর সূক্ষ্ম চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, এই জাতির সংগ্রামের ও ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। ফলে যেকোনো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করার এক অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ শক্তি এই জনগোষ্ঠীর রক্তেই প্রবাহমান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, উনিশ শতকের তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ সামগ্রিক অর্থে কোনো পূর্ণাঙ্গ রেনেসাঁ ছিল না। এটি মূলত হিন্দু পুনরুত্থানবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কৃষক সমাজের শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যায়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রবাহ এবং ৪৭ ও ৭১-এর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এ দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয় বা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ গড়ে উঠেছে।
বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি সংকটকালে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ফ্যাসিবাদের তোষামোদি করেছে। অতীতে হিটলারের পেছনে যেমন অনেক নামজাদা বুদ্ধিজীবী লাইন ধরেছিলেন, আমাদের দেশেও ফ্যাসিবাদের সময়ে তা দেখা গেছে। তারা নিখোঁজ, গুম বা ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। অথচ দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা চিরকাল মাটির মানুষের পাশে থাকেন এবং সত্য কথা বলেন।
সেমিনারে জাতীয় সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো ও দেশের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এই উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐক্যের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক ড. মুস্তাফা মজিদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন:
আব্দুস সালাম আজাদ — যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য, বিএনপি
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল — সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি ও চিত্রনায়ক
মীর সরফত আলী সপু — স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
আবু সালেহ — একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার
ড. আব্দুল লতিফ মাসুম — সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
এ ছাড়া আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী, চিত্রনায়ক হেলাল খান, বরেণ্য সাংবাদিক গাজীউল হাসান খান, সংগীত পরিচালক ইথুন বাবু, মো. আবু হোরায়রা ও পারভীন সুলতানা রাব্বী। সেমিনারে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।#