
বিশেষ প্রতিনিধি: রাজশাহীর বাঘায় দুটি ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও ভেজাল গুড় তৈরির বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে উদ্ধারকৃত ভেজাল সামগ্রী জনসম্মুখে বিনষ্ট করা হয়। তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ এই অপরাধে নামমাত্র ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান নিয়ে সচেতন মহলের মাঝে চরম প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের পীরগাছা বাজারের দক্ষিণ পাশে, নওটিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান গেট সংলগ্ন সোহেল আলীর বাড়িতে প্রথম অভিযানটি চালানো হয়। অভিযুক্ত সোহেল ওই গ্রামেরই বাসিন্দা মহসিন আলীর ছেলে। এছাড়া আড়ানী চক সিঙ্গা এলাকায় আরেকটি ভেজাল গুড়ের কারখানায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
অভিযানকালে কারখানা দুটি থেকে বিপুল পরিমাণ চিনির বস্তা, আটা, ফিটকিরি, চুন, কাপড়ের লাল রঙ, হাইড্রোজ (সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট) এবং প্রস্তুতকৃত ভেজাল গুড় উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে এসব কারখানায় বিষাক্ত গুড় তৈরি হচ্ছিল। খাঁটি খেজুর বা আখের রসের পরিবর্তে কম দামি চিনি গলে আটা মিশিয়ে ঘন করা হতো। পরবর্তীতে রঙ আকর্ষণীয় করতে কাপড়ের লাল রঙ এবং সাদা বা উজ্জ্বল করতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল হাইড্রোজ ও ফিটকিরি ব্যবহার করা হতো। এসব বিষাক্ত গুড় বাঘা, লালপুর ও ঈশ্বরদীসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে খাঁটি গুড় হিসেবে বাজারজাত করা হতো।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাইড্রোজ ও ফিটকিরি মানবদেহের কিডনি ও লিভার বিকল করে দেয় এবং খাদ্যনালীতে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে। এছাড়া কাপড়ের টেক্সটাইল ডাই বা রঙ সরাসরি ক্যান্সারের জন্য দায়ী। চুন ও আটার মিশ্রণ হজমশক্তি নষ্ট করে দীর্ঘমেয়াদী পেটের রোগ তৈরি করে।
নওটিকা স্কুলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “স্কুল গেটের পাশেই এই বিষ তৈরি হচ্ছিল। আমাদের কোমলমতি বাচ্চারা সারাদিন এই কেমিক্যালের গন্ধের মধ্যে ক্লাস করে। আমরা এই কারখানাগুলোর স্থায়ী সিলগালা চাই।”
বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অমিত কুমার জানান, স্কুলের মতো সংবেদনশীল স্থানে এ ধরনের বিষাক্ত কারখানা চলায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ছিল।
অভিযান পরিচালনা করেন বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান অনন্যা। তিনি জানান, “ভেজাল খাদ্য তৈরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪১ ধারায় অভিযুক্তদের মধ্যে একজনকে ৭ হাজার ও অন্যজনকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, মাত্র কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করে এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের থামানো সম্ভব নয়। কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে সিলগালা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।#