
_____ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামি পঞ্জিকার শাবান মাস অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। এই মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতটিই ‘শবে বরাত’ হিসেবে মুসলিম সমাজে পরিচিত। ‘শবে বরাত’ ফারসি পরিভাষা হলেও এর মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা অর্ধ-শাবানের রজনীর মধ্যে। সৃষ্টির তাকদির নির্ধারণ বা ভাগ্য রজনী হিসেবে এটি পরিচিত হলেও মূলত এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও করুণা লাভের এক অনন্য বসন্ত। নিম্নে কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো। শবে বরাতের গুরুত্ব ও হাদিসের প্রামাণ্যতা শবে বরাতের গুরুত্ব নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও বড় একদল আলেমের মতে, এই রাতের ফজিলত একেবারে ভিত্তিহীন নয়। বেশ কিছু শক্তিশালী হাদিস এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে কাজ করে:
আল্লাহর সাধারণ ক্ষমা: হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেন, “অর্ধ-শাবানের রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং- ৫৬৬৫)। এই হাদিসটিকে ইমাম ইবনে হিব্বান সহিহ বলেছেন এবং আলবানি রহ. একে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
দোয়া কবুল হওয়ার রাত: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে এসেছে যে, রাসুল (সা.) এই রাতে দীর্ঘ সেজদায় পড়ে থাকতেন এবং আল্লাহর কাছে গুনাহ থেকে মুক্তি চাইতেন। তিনি বলতেন, এই রাতে বনু কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।
পূর্বসূরিদের আমল: যদিও সাহাবায়ে কেরামের যুগে বড় কোনো আয়োজনের প্রমাণ নেই, তবে তাবেয়ীদের যুগে সিরিয়া অঞ্চলের প্রখ্যাত আলেমগণ (যেমন: খালেদ ইবনে মাদানি, মাকহুল রহ.) এই রাতে মসজিদে একত্র হয়ে ইবাদত করতেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এই রাতের বিধান ও পালনীয় কার্যাবলী ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে শবে বরাতের ইবাদত বাধ্যতামূলক নয়, বরং এটি নফল ও ব্যক্তিগত।
একে কেন্দ্র করে নিম্নোক্ত আমলগুলো করা যেতে পারে: নিভৃত ইবাদত: নফল নামাজ, বিশেষ করে সালাতুত তাসবিহ বা সাধারণ নফল নামাজ পড়া যেতে পারে। তবে নামাজের রাকাত সংখ্যা বা সূরা নির্দিষ্ট করা ইসলামে সমর্থিত নয়।
তওবা ও ইস্তিগফার: এই রাতের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা এবং অতীতের পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া।
কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির: হৃদয়ের প্রশান্তি ও আল্লাহর স্মরণে জিকিরে মশগুল থাকা।
কবর জিয়ারত: মাঝে মাঝে এই রাতে প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করা সুন্নাহর অনুসারী কাজ, কারণ রাসুল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন।
রোজা রাখা: শাবানের ১৫ তারিখে রোজা রাখার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া আইয়ামে বিয বা প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজার সাধারণ ফজিলত তো রয়েছেই।
বর্জনীয় ও ভ্রান্ত ধারণা: একটি সতর্কবার্তা শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বর্তমান সমাজে অনেক ‘বিদআত’ বা নব-আবিষ্কৃত প্রথার জন্ম হয়েছে যা বর্জন করা ইমানি দায়িত্ব:
আলোকসজ্জা ও পটকা ফোটানো: এটি সরাসরি অপচয় এবং অনৈসলামিক কাজ। পবিত্র একটি রাতে আতশবাজি বা হৈ-হুল্লোড় করা ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট করে।
হালুয়া-রুটির প্রথা: এটি সামাজিক প্রথা হতে পারে, কিন্তু একে শবে বরাতের ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে করা বা জরুরি ভাবা ভুল।
কোরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা: অনেকে সূরা আদ-দুখানে বর্ণিত ‘লাইলাতুম মোবারাকাহ’ (বরকতময় রাত) বলতে শবে বরাতকে বোঝান, যা সঠিক নয়। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে সেটি ছিল শবে কদর বা লাইলাতুল কদর।
নির্দিষ্ট রাকাতের নামাজ: ‘শবে বরাতের নামাজ ১২ রাকাত বা ১০০ রাকাত’—এমন কোনো সহিহ ভিত্তি হাদিসে নেই। যার যতটুকু সামর্থ্য, সে তটটুকু নফল ইবাদত করবে।
উপসংহার: শবে বরাত হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য একটি ‘বোনাস’ বা বিশেষ সুযোগ। এটি ভাগ্য পরিবর্তনের চেয়ে বড় হলো নিজের আখলাক বা চরিত্র পরিবর্তনের রাত। এই রাতে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয়টিই বর্জনীয়। অর্থাৎ, একে অস্বীকার করে এর ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি একে কেন্দ্র করে বিদআতে লিপ্ত হওয়াও ক্ষতিকর। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে একাকী ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই হোক একজন সচেতন মুসলমানের লক্ষ্য!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক