
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে রাজপথে সংঘাত, বিশৃঙ্খলা আর অনাচার; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। বিশেষ করে গত ১১ বছর ধরে বেতন বৈষম্যের শিকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়ন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—যেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা ভূলুণ্ঠিত, সেখানে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কি আদৌ সম্ভব?
রাজপথের চিত্র: অরাজকতা ও মানবিক বিপর্যয় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজপথ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে “পাগলা কুকুরের মতো” পেটানো এবং নির্বিচারে রক্তাক্ত করার চিত্র সভ্য সমাজের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এই অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ভয়ের সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। রাজপথে ঝরা এই রক্ত কেবল শান্তি বিঘ্নিত করছে না, বরং আসন্ন নির্বাচনকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পে-স্কেল বঞ্চনা: আন্দোলনের নেপথ্য কারণ পর্যবেক্ষক মহলের মতে, বর্তমান বিশৃঙ্খলার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
দীর্ঘ বঞ্চনা: ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল ঘোষণা না করায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি সেবকরা।
দমন-পীড়ন: পে-স্কেলের দাবিতে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলা পরিস্থিতিকে হিতে বিপরীত করে তুলেছে।
আস্থার সংকট: রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখেন যারা, সেই কর্মচারীরাই যখন রক্তাক্ত হয়ে রাজপথে পড়ে থাকেন, তখন প্রশাসনের ভেতরে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়—যা যেকোনো সরকারের জন্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন করে তোলে।
তথ্য ও উপাত্তের বিশ্লেষণ ১. নির্বাচনী পরিবেশ: একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো জনমনে স্বস্তি। কিন্তু বর্তমান সহিংস পরিস্থিতিতে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ সুদূরপরাহত। ২. অর্থনৈতিক চাপ: বাজারদরের উর্ধ্বগতি আর বেতন স্থবিরতা সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ৩. সমাধানের পথ: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃঢ় ধারণা, সরকার যদি বর্তমান এই উত্তাল পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়, তবে নতুন পে-স্কেল এর গেজেট ঘোষণা ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো বিকল্প রাস্তা খোলা নেই। এই একটি ঘোষণা যেমন লাখ লাখ কর্মচারীর ক্ষোভ প্রশমন করবে, তেমনি রাজপথের উত্তাপ কমিয়ে নির্বাচনের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির সুযোগ করে দেবে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, দমন-পীড়ন বা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো আন্দোলন বা অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ীভাবে দমন করা যায় না। রাজপথের রক্তপাত বন্ধ করতে হলে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট নিরসনে একদিকে যেমন রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন, অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন (পে-স্কেল গেজেট) অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সরকার যদি দ্রুত এই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে বিশৃঙ্খলা ও অনাচারের এই দাবানল আসন্ন নির্বাচনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেবে। গণতন্ত্র রক্ষায় এখন আলোচনার টেবিল এবং ন্যায্য অধিকার প্রদানই হোক প্রধান হাতিয়ার। #
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক