
মোঃআলফাত হোসেন
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, জনগণের ভোটাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নির্ধারক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোর নির্বাচনী অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে এবারের নির্বাচন নিয়ে জনগণের প্রত্যাশার পাশাপাশি গভীর উদ্বেগও রয়েছে। গত ৫৪ বছরের ব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন-অভিপ্রায় তীব্রতর হয়েছে। এত বছর পরও নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় পরিচয়, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ভৌগোলিক অবস্থানে মানুষ প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এ বৈষম্য সবচেয়ে স্পষ্ট। পেশাগত ক্ষেত্রেও একই চিত্র বিদ্যমান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে থাকা ব্যক্তিরা যে সেবা পান, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের মানুষ তা পান না।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে ছিল জীবিকার নিরাপত্তা। জীবিকার প্রশ্ন সামনে আসাতে তরুণেরা রাজপথে নেমেছেন। এতে বোঝা যায়, আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে বৈষম্য কত গভীরে প্রোথিত রয়েছে। নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। একজনের চাকরি মানে একটি পরিবারের নিরাপত্তা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেবায় নাগরিক পরিচয়ের বাইরে কোনো বৈষম্য চলতে পারে না; জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এ দু’টি খাতে বাজেট বরাদ্দ কম। এটা বাড়াতে হবে। এ দেশের সবাই নাগরিক অর্থাৎ হিন্দু, মুসলমান,বৌদ্ধ, খ্রিস্টান,পাহাড়ি বা সমতলের মানুষ কাউকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা সমতলের মতো করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আস্থার সংকট ও ভোটার অনাগ্রহ: গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমেছে, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিলো। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ কমে গেছে। উপকূলীয় এলাকা, যেমন সাতক্ষীরার শ্যামনগর,আশাশুনি ও খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ,বটিয়াঘাটা উপজেলার মতো অঞ্চলে দেখা যায়—মানুষ ভোট দিতে চায়, কিন্তু ভোটের ফলাফল আদৌ তাদের মতামত প্রতিফলিত করবে কি না, সেই আস্থাটুকু নেই। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই মূল চাবিকাঠি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং সমান সুযোগ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচন কার্যত অর্থহীন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সমানভাবে প্রচারণা চালাতে পারবেন এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা: নির্বাচন কমিশনের ওপরই সবচেয়ে বেশি দায় বর্তায়। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং ফল ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সর্বমহলে আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে।
উপকূল ও প্রান্তিক মানুষের প্রত্যাশা: উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কাছে নির্বাচন মানে কেবল ব্যালট নয়—এটি জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, সুপেয় পানির সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব—এসব সমস্যার সমাধান চায় মানুষ। তারা এমন প্রতিনিধি চান, যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে এসব বাস্তব সমস্যা তুলে ধরবেন, কেবল দলীয় আনুগত্য দেখাবেন না। তরুণ সমাজ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন প্রাণবন্ত হতে পারে না।
এবারের নির্বাচন তরুণদের কাছে রাজনীতির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগও হতে পারে। সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, এবারের সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি পরীক্ষার সময়। এটি হতে পারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন অধ্যায়, আবার অব্যবস্থাপনায় জনগণের আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল এই নির্বাচন ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে স্মরণীয় হবে। তবে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই নিজেদের পথের কাঁটা হওয়া থেকে দূরে সরে আসতে হবে। দেশ ও জাতির উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রক্ষমতার চাবি হাতে থাকা যেহেতু জরুরি সেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায় যাওয়া।
ক্ষমতায় যেতে অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে রাজনৈতিক দলগুলো এখন মরিয়া হয়ে উঠবে- এমনটাই স্বাভাবিক। তবে শিষ্টাচারসম্মত রাজনীতির জন্য জনপ্রতিনিধিদের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি। আমাদের নিজেদের বিবেক এবং চিন্তা যদি পরিশীলিত বা মার্জিত না হয় তাহলে কোনোভাবেই ইতিবাচক প্রত্যাশা সফল হবে না। আমরা বাংলাদেশে যে কাঠামেই চয়েস করি না কেন কিংবা যেমন আইনই তৈরি করি না কেন, অথবা যেমন সংস্কারই হোক না কেন, এগুলো বাস্তবায়নের মূলে রয়েছে নাগরিক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন।
মানসিকতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একটি গ্রহণযোগ্যমানের উদার নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। দেশের সাধারণ জনগণ দেশের রাজনীতির একটি গুণগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করে। আর এ কারণে নতুন রাজনৈতিক দলসহ দেশে বিদ্যমান সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্দেশে বলব আপনারা যদি দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চান, তাহলে মনে রাখবেন, রাজনীতি মানে উগ্রতা, প্রতিহিংসা নয়, রাজনীতি মানে শালীনতা, ভদ্রতা এবং সহনশীলতা। আর এসব গুণাবলির মধ্য দিয়ে জনগণের মনে স্থান করে নিতে হবে। রাগ, হিংস্রতা কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ দিয়ে রাজনীতি করলে কখনোই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে না।
আমরা সাধারণ জনগণ ভালো এবং নতুন কিছু প্রত্যাশা করি। আর এ জন্য পরিবর্তন শুধু মুখে নয় আচরণে এবং কার্যক্রমে প্রমাণ করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি পরিবর্তন সম্ভব পরিবর্তন চাই।#
লেখক: মোঃ আলফাত হোসেন সংগঠক,সাতক্ষীরা জেলা গণসংহতি আন্দোলন।