
_____ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থিত হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর রওজা মোবারক মুসলিম উম্মাহর নিকট পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান। ইসলামের শত্রু ও ক্রুসেডাররা বিভিন্ন যুগে মুসলিমদের ঈমানি মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এবং ইসলামের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে নানাবিধ চক্রান্ত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও শিহরণ জাগানো চক্রান্ত ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দেহ মোবারক চুরির অপচেষ্টা। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনাটি কেবল একটি চক্রান্তের গল্প নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর বিশেষ কুদরত ও তাঁর রাসূলের সুরক্ষার এক জীবন্ত দলিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সুলতানের স্বপ্ন ও মদিনা যাত্রা ৫৫৭ হিজরি (১১৬২ খ্রিস্টাব্দ)। সিরিয়ার ন্যায়পরায়ণ শাসক সুলতান নূরুদ্দীন মাহমুদ জেনেকী (রহ.) এক রাতে তাহাজ্জুদের পর স্বপ্নে দেখলেন— স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) দুইজন নীল চক্ষুবিশিষ্ট আগন্তুককে দেখিয়ে বলছেন, “নূরুদ্দীন! এদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।” ভীতসন্ত্রস্ত সুলতান জেগে উঠলেন। একই স্বপ্ন টানা তিনবার দেখার পর তিনি তাঁর বিজ্ঞ উজির জামালুদ্দীন মোসেলির পরামর্শে ২০ জন অশ্বারোহী সৈন্য এবং প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে অতি গোপনে দামেস্ক থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সাধারণত দামেস্ক থেকে মদিনার পথ দীর্ঘ হলেও, সুলতান মাত্র ১৬ দিনে মদিনায় পৌঁছান।
ষড়যন্ত্রের উন্মোচন ও অপরাধীদের শনাক্তকরণ : মদিনায় পৌঁছে সুলতান নূরুদ্দীন জেনেকী পুরো শহর ঘেরাওয়ের নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি মদিনাবাসীদের রাজকীয় উপহার দেবেন। উদ্দেশ্য ছিল মদিনার প্রতিটি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে দেখা। উপহার নিতে আসা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে সুলতান সেই দুই ব্যক্তিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না যাদের তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন। একপর্যায়ে জানা গেল, আন্দালুস (স্পেন) থেকে আসা দুইজন ইবাদতগুজার ব্যক্তি মসজিদে নববীর পাশে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকে। তারা নিয়মিত জান্নাতুল বাকিতে যেতেন এবং মদিনার গরিবদের অকাতরে দান করতেন। সুলতান তাদের ডেকে আনলে চিনে ফেলেন যে, স্বপ্নে এঁদেরকেই দেখানো হয়েছিল।
সুড়ঙ্গ ও গোপন চক্রান্ত : প্রাথমিকভাবে তারা নিজেদের ইবাদতকারী পর্যটক হিসেবে দাবি করলেও সুলতানের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে। তাদের ঘরে তল্লাশি চালিয়ে খাটের নিচে একটি কার্পেট এবং তার নিচে একটি বিশাল পাথর পাওয়া যায়। সেই পাথর সরাতেই দেখা যায় এক গভীর সুড়ঙ্গ, যা সরাসরি রওজা মোবারকের দিকে চলে গেছে। তারা স্বীকার করে যে: তারা ছিল ছদ্মবেশী খ্রিস্টান গুপ্তচর। তাদের পরিকল্পনা ছিল সুড়ঙ্গ দিয়ে রওজা মোবারকের ভেতর প্রবেশ করে দেহ মোবারক চুরি করা। তারা সুড়ঙ্গ খননের মাটিগুলো চামড়ার থলেতে ভরে জান্নাতুল বাকিতে ঘুরতে যাওয়ার ছলে ফেলে আসত। তদন্তে দেখা যায়, সুড়ঙ্গটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দেহ মোবারকের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। সুলতান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেন।
সীসার অভেদ্য প্রাচীর নির্মাণ : ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুলতান নূরুদ্দীন জেনেকী রওজা মোবারকের চারদিকে গভীর পরিখা খনন করেন। এরপর কয়েক টন তামা ও সীসা গলিয়ে সেই পরিখায় ঢেলে দেওয়া হয়। এতে রওজা মোবারকের চারপাশে মাটির গভীরে একটি নিরেট ও অভেদ্য প্রাচীর তৈরি হয়, যা ভেদ করা মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব।
উপসংহার: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— “আল্লাহ আপনাকে মানুষের (অনিষ্ট) থেকে রক্ষা করবেন” (সূরা মায়িদা: ৬৭)। সুলতান নূরুদ্দীন জেনেকীর এই ঘটনাটি সেই বাণীরই এক বাস্তব প্রতিফলন। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বিশ্বজাহানের স্রষ্টা নিজেই তাঁর প্রিয় হাবীবের পাহারাদার। আজ পর্যন্ত সেই সীসার প্রাচীর রওজা মোবারককে ঘিরে রেখেছে এবং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক প্রশান্তির ছাপ রেখে যাচ্ছে!… তথ্যসূত্র (Bibliography) ১. ওয়াফাউল ওয়াফা বি আখবারি দারিল মোস্তফা – আল্লামা নূরুদ্দীন আলী বিন আহমদ আস-সামহুদী। (এটি মদিনার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ)। ২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১২শ খণ্ড) – হাফেজ ইবনে কাসীর। ৩. আর-রাওদাতাইন ফি আখবারিদ দাওলাতাইন – ইমাম আবু শামা আল-মাকদিসি। ৪. তারিখুল মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ – ইবনে নাজ্জার। ৫. খুলাসাতুল ওয়াফা – আল্লামা সামহুদী।#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক