
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: রাজনীতি কেবল জনসভা বা স্লোগানের বিষয় নয়, এটি একটি শিল্প যেখানে প্রতিটি শব্দ মেপে উচ্চারণ করতে হয়। একজন নেতার কথা যেমন লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, তেমনি একটি অপরিপক্ক বা যুক্তিহীন বক্তব্য তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সম্প্রতি বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নামে প্রচারিত একটি বক্তব্য—যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ঐশ্বরিক সতর্কতা হিসেবে দাবি করা হয়েছে—তা সুধী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিস্ময় এবং সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যে বুজরুকিপনা ও অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার নেতিবাচক প্রভাব একটি সার্থক রাজনৈতিক বক্তব্যের মূল শক্তি হলো এর যৌক্তিক ভিত্তি এবং তথ্য-উপাত্তের সঠিক ব্যবহার। ভূমিকম্প একটি সম্পূর্ণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ঘটে। এটিকে যখন কোনো রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় আচরণের শাস্তিস্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়, তখন তা কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং অলৌকিকতার আশ্রয় নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক বুজরুকিপনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। শরীরকে যেমন মেদবাহুল্য থেকে মুক্ত রাখতে পারলে শরীর সুস্থ থাকে, তেমনি জনসংযোগের সময় বাহুল্য বচন থেকে মুক্ত থাকা জরুরি।
রাজনীতির মাঠে অহেতুক, অপ্রাসঙ্গিক ও অবাস্তব কথা হলো সেই “মেদ”, যা নেতার ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য কমিয়ে দেয় এবং প্রতিপক্ষকে সমালোচনার সহজ সুযোগ করে দেয়। তথ্য ও যৌক্তিকতার প্রভাব আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ অনেক বেশি সচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক। এই ধরণের অযৌক্তিক বক্তব্যের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট: অলৌকিকতার দোহাই দিয়ে বুজরুকিপনা পূর্ণ বক্তব্য শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্মের কাছে নেতার গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। মূল ইস্যু থেকে বিচ্যুতি: অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।
ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বিভ্রান্তি: রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রাকৃতিক ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বোধকে বিভ্রান্ত করার শামিল।
উপসংহার: নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান গুণ হলো কী বলতে হবে তার চেয়ে বেশি কী বলা যাবে না তা অনুধাবন করা। তারেক রহমানের মতো একজন শীর্ষ নেতার উচিত হবে প্রাগৈতিহাসিক বা অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে বরং জনকল্যাণ, সুশাসন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করা। রাজনৈতিক বক্তৃতায় সংযম এবং পরিমিতিবোধই একজন নেতাকে দীর্ঘস্থায়ী জনশ্রদ্ধা এনে দিতে পারে। “বাহুল্য বচন” ও “বুজরুকিপনা” বর্জন করে গঠনমূলক এবং বিজ্ঞানমনস্ক রাজনীতির চর্চাই হোক বর্তমান সময়ের দাবি!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক