
___ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামি শরিয়তে মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের পার্থিব জীবনের কর্মতৎপরতা শেষ হলেও রূহানি জগতের সওয়াব বা প্রতিদান পাওয়ার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয় না। মহানবী (সা.)-এর অমিয় বাণীর মাধ্যমে আমরা এমন কিছু মাধ্যমের কথা জানতে পারি, যা কবরে থাকা ব্যক্তির আমলনামায় নিয়মিত নেকি যুক্ত করে। তবে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আবেগের সুযোগ নিয়ে অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন কিছু বক্তব্য সমাজে প্রচলিত হচ্ছে। পরকালীন নাজাতের সঠিক পথ বুঝতে হলে আমাদের বিশুদ্ধ সুন্নাহর দিকেই ফিরে যেতে হবে।
সহিহ হাদিসের আলোকবর্তিকা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ”যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি মাধ্যম ছাড়া: ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. উপকারী ইলম এবং ৩. নেক সন্তান—যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৩১) এই হাদিসটি একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দেয়। এখানে ‘আমল বন্ধ হওয়া’র অর্থ হলো মানুষ নিজে থেকে নতুন কোনো ইবাদত (নামাজ, রোজা) করতে পারবে না। তবে এই তিনটি বিষয় তার পূর্বকৃত বিনিয়োগ বা রেখে যাওয়া নেক কাজের ফসল হিসেবে গণ্য হবে।
তিনটি মাধ্যমের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ১. সদকায়ে জারিয়া: এমন দান যার উপকার দীর্ঘস্থায়ী। যেমন—মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা বা জনকল্যাণমূলক কোনো স্থায়ী স্থাপনা। ২. উপকারী ইলম: মানুষকে দ্বীন শেখানো, কল্যাণকর বই লিখে যাওয়া বা দ্বীনি প্রচারণার এমন ব্যবস্থা করা যা থেকে পরবর্তী প্রজন্ম উপকৃত হয়। ৩. নেক সন্তান: মৃত ব্যক্তির জন্য সন্তানের দোয়া সবচেয়ে বড় পাথেয়। সন্তান যদি নেককার হয়, তবে তার প্রতিটি ইবাদতের একটি অংশ বাবা-মা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেতে থাকেন। ’কবরের আজাব বন্ধের গ্যারান্টি’ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট আমাদের সমাজে অনেক বক্তা বা ওয়াজিনকে আবেগঘন কণ্ঠে বলতে শোনা যায় যে, “বাবা-মায়ের নামে অমুক প্রতিষ্ঠানে দান করুন, সাথে সাথেই কবরের আজাব মাফ হয়ে যাবে।” এই জাতীয় বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
প্রতারণামূলক প্রচারণা: দান-সদকা অবশ্যই গুনাহ মোচন করে এবং কবরের আজাব লাঘবে সহায়ক হয় (তিরমিজি, হাদিস নং ২৫৪১), কিন্তু একে ‘ব্যবসা’ বা ‘গ্যারান্টি’ হিসেবে উপস্থাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। নিয়তের বিশুদ্ধতা: দান হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কোনো বক্তার কথায় প্ররোচিত হয়ে বা কোনো নির্দিষ্ট সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে দান করলে তার সওয়াব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। অসিয়ত ও উত্তরাধিকার: মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে দান করার ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে (যেমন ১/৩ ভাগের বেশি অসিয়ত কার্যকর হয় না)। উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করে দান করার প্রচারণা অনেক সময় জুলুমের পর্যায়ে পড়ে।
মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় (ইসালে সওয়াব) বিশুদ্ধ মতানুসারে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-খয়রাত করা জায়েজ এবং এতে মৃত ব্যক্তি সওয়াব পান। তবে একে কেন্দ্র করে কোনো মাহফিলে ‘হুজুরদের পকেট ভারী করা’ বা ‘কবরের আজাব বন্ধের শতভাগ নিশ্চয়তা’ দেওয়া এক ধরণের ধর্মীয় বিভ্রান্তি। দোয়া এবং ইসালে সওয়াব হতে হবে সম্পূর্ণ ইখলাসের সাথে।
উপসংহার পরকালীন মুক্তি কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর দয়া এবং বান্দার সারা জীবনের অর্জিত ইমানের ওপর নির্ভরশীল। উপরের হাদিসটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জীবিত থাকাকালীন আমাদের এমন কিছু কাজ করে যাওয়া উচিত যা মৃত্যুর পর ‘সদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে টিকে থাকবে। বক্তাদের উচিত সাধারণ মানুষকে কেবল সাময়িক দানে উৎসাহিত না করে, সন্তানদের নেককার হিসেবে গড়ে তোলা এবং জনকল্যাণমূলক স্থায়ী কাজে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করা। ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত বক্তব্য পরিহার করে সহিহ সুন্নাহর প্রচারই হোক আমাদের লক্ষ্য!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক