______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: কূটনৈতিক পরিভাষায় ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ (Non-Family Posting) হলো এমন একটি বিশেষ প্রটোকল, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো দেশে কর্মরত কর্মকর্তাদের সাথে তাদের পরিবার (স্ত্রী ও সন্তান) রাখার অনুমতি দেওয়া হয় না। সাধারণত যেসব দেশে যুদ্ধবিগ্রহ, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা বা উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে, সেখানেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তারই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার বাংলাদেশে তাদের মিশনগুলোতে এই কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। কেন এই সিদ্ধান্ত? প্রধান কারণসমূহ বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো প্রথাগত যুদ্ধ চলছে না, তবুও ভারত নিচের বিষয়গুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে:
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও বিক্ষোভ: ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীর ভারতীয় হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশনগুলোর সামনে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ায় এই আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
২০২৬-এর নির্বাচন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় ভারত তাদের কর্মকর্তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়াকে একটি ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখছে।
আস্থার সংকট ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন: দুই দেশের মধ্যে বর্তমানের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং একে অপরের কূটনীতিকদের তলব করার মতো ঘটনাগুলো সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে।
উগ্রপন্থার উত্থানের আশঙ্কা: ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য রয়েছে, যা কূটনীতিকদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও জনগণের করণীয় এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. সরকারের দায়িত্ব: ভিয়েনা কনভেনশন অনুসরণ: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী diplomatic মিশন ও কর্মকর্তাদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোর চারপাশে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা।
কার্যকর সংলাপ: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
স্থিতিশীলতা বজায় রাখা: আসন্ন নির্বাচন সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করা যে পরিস্থিতি বিদেশিদের বসবাসের জন্য অনুকূল।
২. সাধারণ জনগণের ভূমিকা: আবেগ সংবরণ: কোনো দেশের নীতির বিরোধিতা করার অধিকার থাকলেও তা যেন কোনোভাবেই কূটনৈতিক মিশনের ওপর চড়াও হওয়ার রূপ না নেয়।
গুজব প্রতিরোধ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক বা মিথ্যা তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় তিক্ততা তৈরি করে।
সম্প্রীতি রক্ষা: সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এটি প্রমাণ করা যে বাংলাদেশ একটি সহনশীল ও নিরাপদ রাষ্ট্র।
তথ্য ও উপাত্ত: একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র মিশন সংখ্যা: বর্তমানে বাংলাদেশে ভারতের ৫টি মিশন রয়েছে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা)।
বর্তমান অবস্থা: সকল মিশনে ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ কার্যকর; অর্থাৎ কর্মকর্তারা পরিবার ছাড়া অবস্থান করছেন।
ভিসা সেবা: বর্তমানে সাধারণ টুরিস্ট ভিসা স্থগিত রয়েছে; শুধুমাত্র জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষা সংক্রান্ত ভিসা সীমিত পরিসরে দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা গ্রেড: ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে বাংলাদেশকে উচ্চ সতর্কতামূলক বা ‘High-Alert’ জোনে রেখেছে।
উপসংহার: ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি সাময়িক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। তবে এটি দুই দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ যদি ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে আশা করা যায় ভারত পুনরায় এই নীতি শিথিল করবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার স্বার্থে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আস্থার পুনর্গঠনই এখন সময়ের দাবি।#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক