
ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: উন্নতির শিখরেও কেন বাড়ে বিদ্বেষ? শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সাক্ষী আমরা। কিন্তু এই উন্নতির পাশাপাশি মানুষের মনোজগতে যে উদারতা, সহনশীলতা ও প্রগতিশীলতার বিকাশ ঘটার কথা ছিল, তা ঘটেনি। বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে—রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি এবং সাধারণ আলাপচারিতায়—অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা এক মহামারীর রূপ নিচ্ছে। প্রতিটি ভিন্ন মতকে আক্রমণাত্মকভাবে মোকাবিলা করা যেন এক নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত পরিসরের মতো মতাদর্শগত ভিন্নতাও স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যকর এবং তাকে সম্মান করা আবশ্যক। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি “শান্তিচুক্তি” আজ সময়ের দাবি—যার মূলমন্ত্র হবে: “আমরা সবাইকে বাঁচতে দেবো।”
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ: নিরাপত্তাহীনতা ও ‘গোষ্ঠীগত মেরুকরণ’ মনস্তত্ত্বের দিক থেকে অসহিষ্ণুতার জন্ম মূলত নিরাপত্তাহীনতা (Insecurity) ও ‘গোষ্ঠীগত মেরুকরণ’ (In-group/Out-group Polarization) থেকে।
১. নিরাপত্তাহীনতা ও আত্ম-মূল্যায়ন: যখন কোনো ব্যক্তি তার আত্ম-পরিচয় বা আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন তারা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে একটি **”নিরাপদ গোষ্ঠী”**র আশ্রয় নেন। ভিন্ন মতকে হুমকি মনে হয়, কারণ তা তাদের ভঙ্গুর আত্ম-মূল্যায়নকে (Self-esteem) আঘাত করে।
২. জ্ঞানীয় পক্ষপাত (Cognitive Biases): মানুষ সাধারণত সেই তথ্যই বিশ্বাস করতে চায় যা তার পূর্বের বিশ্বাসকে সমর্থন করে (Confirmation Bias)। এই প্রবণতার কারণে ভিন্ন মতকে তারা শুধু ভুল নয়, বরং ‘শত্রু’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। যুক্তি নয়, আবেগ ও পরিচিত গোষ্ঠীর আনুগত্য প্রধান চালক হয়ে ওঠে।
৩. সহিংসতা ও মুক্তি: দীর্ঘদিন চাপা থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য এবং বিচারহীনতার পরিবেশ মানুষকে আরও হিংস্র করে তোলে। এই চাপা ক্ষোভ অনেক সময় অন্যের প্রতি সহিংসতার মাধ্যমে আবেগিক মুক্তি (Emotional Release) খোঁজে। ধর্মীয় চিন্তাধারা: মর্মার্থের ভুল ব্যাখ্যা ও উদারতার আহ্বান পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মই ক্ষমা, সহনশীলতা ও অপরের প্রতি দয়ার কথা বলে। কিন্তু অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে ধর্মের মর্মার্থের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা একটি বড় ভূমিকা পালন করে:
১. ধর্মের অপব্যবহার: ধর্মকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটি সংকীর্ণ ব্যাখ্যা সামনে এনে মানুষের মনে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। অথচ, ধর্মগুলো বৃহত্তর মানব-পরিচয় এবং পারস্পরিক সমবেদনার উপর জোর দেয়। যেমন: ইসলামে বলা হয়েছে, “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য এবং আমার ধর্ম আমার জন্য” (সূরা কাফিরুন ৬) এবং সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে, “বসুধৈব কুটুম্বকম্” (পৃথিবী একটি পরিবার)।
২. শান্তিই মূল ভিত্তি: ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার দুর্বলতার প্রতীক। যেখানে সহনশীলতা, ধৈর্য এবং ক্ষমা একটি উন্নত আত্মার প্রতিফলন। ধর্ম কখনোই ধ্বংস নয়, সৃষ্টি ও সুস্থিতির বার্তা দেয়। কাঠামোগত পরিবর্তন: শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথ শান্তিচুক্তিকে কেবল মন বা বিশ্বাসের স্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সামাজিক ও কাঠামোগত পদক্ষেপ।
১. মূল্যবোধ-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল জ্ঞান-ভিত্তিক না রেখে মূল্যবোধ-ভিত্তিক করতে হবে—যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking), ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ এবং সহানুভূতি (Empathy) বিকাশের সুযোগ থাকবে।
২. আইনের শাসন ও বিচার নিশ্চিতকরণ: বিচারহীনতার সংস্কৃতি অসহিষ্ণুতাকে সরাসরি উৎসাহিত করে। সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা অন্য কোনো অজুহাতে হামলাকারীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। এই কাঠামোগত স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই হলো জনগণের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা দূর করার এবং শান্তিচুক্তিকে টেকসই করার বাস্তব পদক্ষেপ।
৩. গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা: সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে অবশ্যই মেরুকরণ (Polarization) কমানোর দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের উচিত ভারসাম্যপূর্ণ খবর পরিবেশন করা এবং বিদ্বেষমূলক বা উস্কানিমূলক আলোচনা পরিহার করে ইতিবাচক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা।
জনগণের শান্তিচুক্তি: ভিন্নতাকে মেনেই একতা এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার প্রস্তাবিত **’শান্তিচুক্তি’**র ভিত্তি হলো: ১. মতামতের ভিন্নতাকে সম্মান জানানো: ব্যক্তিগত টুথব্রাশের মতো প্রতিটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস এবং মতাদর্শ একান্তই তার নিজস্ব। একতা মানে সবার একই মত হওয়া নয়, বরং মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও এক ছাদের নিচে শান্তিপূর্ণভাবে থাকা। ভিন্নমতকে আলোচনার উপাদান হিসেবে দেখা, ‘শত্রুতা’ হিসেবে নয়।
২. মানবিক ভিত্তি: চুক্তির মূলকথা হবে “আমরা সবাইকে বাঁচতে দেবো”—যা মানুষ হিসেবে প্রতিটি জীবনের মূল্যকে স্বীকার করে। রাজনৈতিক বিভেদ বা ধর্মীয় মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং জীবনধারণের অধিকার সবারই সমান। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি নাগরিকের দায়বদ্ধতা হলো: অসহিষ্ণু মন্তব্য এড়িয়ে চলা, বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে দূরে রাখা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপে অংশ নেওয়া। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
উপসংহার: ভবিষ্যতের জন্য আমাদের অঙ্গীকার সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার এই চক্র ভাঙতে হলে মনস্তত্ত্ব, ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, আমাদের শিখতে হবে ভিন্নমতকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখে একটি সমাজের স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতে। ধর্মীয়ভাবে, ধর্মের মূল শিক্ষা—শান্তি ও দয়া—অনুসরণ করে সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরোতে হবে। এবং কাঠামোগতভাবে, রাষ্ট্রের উচিত হবে ন্যায়বিচার ও সহনশীল শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা। আজ বাংলাদেশের জনগণের এই শান্তিচুক্তি হোক একটি সামাজিক অঙ্গীকার: “আমরা ভিন্ন পথে চলব, কিন্তু গন্তব্য হবে এক—একটি সহনশীল, শান্তিময় ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।” ভিন্নতা আমাদের দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের শক্তির উৎস”।
# লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক