
________ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামী বর্ষপঞ্জির নবম মাস পবিত্র রমজান মুমিনের জীবনে এক আধ্যাত্মিক বসন্ত। এটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক মহত্তম প্রশিক্ষণ। রমজান মাসকে মহান আল্লাহ তিনটি বিশেষ ভাগে বিভক্ত করেছেন, যার প্রথম দশ দিন হলো ‘রহমত’ বা আল্লাহর বিশেষ করুণা বর্ষণের সময়। এই দশ দিন মুমিনের জন্য এক অনন্য সুযোগ, যেখানে দয়াময় আল্লাহ তাঁর অফুরন্ত রহমতের দুয়ার খুলে দেন। মহানবী (সা.)-এর ভাষায়: “রমজানের প্রথম দশ দিন হলো রহমতের, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতের, আর শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির।” (মুসনাদ আহমদ)
রমজানের প্রথম দশক: আল্লাহর অফুরন্ত করুণার ফল্গুধারা রমজানের শুরুতেই মুমিন বান্দা এক বিশেষ স্বর্গীয় আবহে প্রবেশ করে। সহীহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, রমজান শুরু হওয়া মাত্রই জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি প্রথম বড় রহমত, যাতে বান্দা কোনো বাধা ছাড়াই নেক আমলের পথে অগ্রসর হতে পারে। এই দশ দিনে আল্লাহর রহমত বৃষ্টির মতো বর্ষিত হয়। যারা বছরের বাকি সময় পাপে নিমগ্ন ছিল, তাদের জন্য এই দশ দিন হলো নতুন করে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সূচনালগ্ন। এই সময়ে সিয়াম পালনের মাধ্যমে মানুষের অন্তরের কাঠিন্য দূর হয় এবং দয়া ও মমত্ববোধ জাগ্রত হয়। রহমতের দশকে বিশেষ আমল ও ইবাদত রহমতের এই ১০ দিনকে সার্থক করতে আমাদের জীবনযাত্রায় নিচের
আমলগুলো যুক্ত করা আবশ্যক: ১. সালাতে একাগ্রতা ও তাহাজ্জুদ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ জামাতের সাথে আদায়ের পাশাপাশি এই মাসে তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। সাহরি খাওয়ার জন্য যেহেতু আমাদের জাগতেই হয়, তাই অন্তত ২ বা ৪ রাকাত তাহাজ্জুদ আদায় করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়।
২. কুরআনের সাথে গভীর মিতালি যেহেতু রমজান মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই প্রতিদিন তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ ও তাফসির বোঝার চেষ্টা করা উচিত। প্রতিদিন অন্তত এক পারা তিলাওয়াত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
৩. বিশেষ জিকির ও দোয়া রহমতের দশকের জন্য একটি বিশেষ মাসনুন দোয়া হলো: رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ (উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন) অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন, দয়া করুন। আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
৪. দান-সদকা ও পরোপকার রমজানে দান করলে সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবীদের ইফতার করানো বা সাহায্য করা রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৫. সুন্নাহর অনুশীলন দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট সুন্নাহ যেমন—মিসওয়াক করা, সালামের প্রসার ঘটানো, এবং মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করবে। আত্মশুদ্ধি ও আচরণের পরিবর্তন রমজান আমাদের শেখায় ধৈর্য। প্রথম দশ দিনে ক্ষুধার তৃষ্ণার চেয়েও বড় পরীক্ষা হলো জিহ্বা ও চোখের নিয়ন্ত্রণ। পরনিন্দা (গিবত), মিথ্যা বলা এবং অহেতুক তর্ক থেকে বিরত থাকাই হলো প্রকৃত সিয়াম। এই রহমতের দিনে আমাদের হৃদয়কে অহংকারমুক্ত করে বিনয়ী হওয়ার শপথ নিতে হবে। উপসংহার রমজানের প্রথম দশ দিন হলো মুমিনের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর। যদি শুরুতে আমরা আল্লাহর রহমত দিয়ে নিজেদের অন্তরকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পারি, তবেই পরবর্তী ‘মাগফিরাত’ ও ‘নাজাত’ অর্জন সহজ হবে। এই রহমতের দিনগুলো আমাদের অলসতায় কাটানো উচিত নয়। রমজানে আমাদে আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতিফলন ঘটে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর রমজান হলো পরকালের পাথেয় সংগ্রহের শ্রেষ্ঠ মৌসুম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের প্রথম দশকের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত ও জিকিরের মাধ্যমে রহমতস্নাত করার তাওফিক দান করুন। আমিন!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক