
___ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্র এক চরম সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। দীর্ঘ সময় রাজপথের আন্দোলন এবং নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে নতুন যাত্রা শুরু করেছে, তখন জাতির সামনে এক নতুন প্রশ্ন—কেমন হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ? সম্প্রতি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বিশাল জনসমুদ্রে তারেক রহমান যখন মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে স্মরণ করে বলেন, “আমারও একটি স্বপ্ন আছে (আই হ্যাভ এ প্ল্যান)”, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং ভঙ্গুর রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের এক শক্তিশালী অঙ্গীকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমান নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংকটের স্বরূপ বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল ও নাজুক। গত কয়েক দশকের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।
সাংবিধানিক সংকট: ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে জনমনে সংশয়।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা: উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবনতি। বিভেদের রাজনীতি: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের “স্বপ্ন” বা “পরিকল্পনা” সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো দেখাচ্ছে।
তারেক রহমানের পরিপক্বতা: নেতার রূপান্তর তারেক রহমান কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে নেতা নন; বরং দেড় দশকের নির্বাসিত জীবন এবং কঠিন রাজনৈতিক সংগ্রাম তাঁকে একজন পরিপক্ব ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছে। বর্তমান সময়ে তাঁর বক্তব্যে যে সংযম, জাতীয় ঐক্যের ডাক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা তাঁর নেতৃত্বের এক ইতিবাচক পরিবর্তন। তিনি এখন কেবল বিএনপির নেতা নন, বরং গণতন্ত্রকামী বিশাল এক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ”আমার একটি স্বপ্ন আছে”: স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন তারেক রহমান তাঁর ‘প্ল্যান’ বা স্বপ্নের যে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, তার মূল ভিত্তি হলো বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা।
এই স্বপ্নের বাস্তব রূপরেখা নিচের দিকগুলো ফুটিয়ে তোলে:
১. রেইনবো নেশন (Rainbow Nation) বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ: তারেক রহমানের স্বপ্নের প্রথম ভিত্তি হলো—প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির ইতি টানা। তিনি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন যেখানে দল-মত নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। “রেইনবো নেশন” ধারণার মাধ্যমে তিনি বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।
২. ক্ষমতার ভারসাম্য ও দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: একনায়কতন্ত্র রোধে তিনি সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয়ে সংসদে ‘উচ্চ কক্ষ’ প্রবর্তন করার মাধ্যমে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপকল্প তিনি তুলে ধরেছেন।
৩. অর্থনৈতিক সাম্য ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র: তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনমান উন্নয়ন। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাঁর অর্থনৈতিক স্বপ্নের প্রধান অংশ।
৪. আইনের শাসন ও মানবাধিকার: বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং গুম-খুনের রাজনীতির অবসান ঘটানোই তাঁর স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন। তিনি এমন এক দেশের কথা বলেছেন যেখানে সাধারণ মানুষ তার ভোটাধিকার নিয়ে চিন্তিত হবে না। তারেক রহমানের স্বপ্নের রাজনৈতিক তাৎপর্য তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর এই স্বপ্ন কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত। তিনি বলেছেন, “আমি কোনো অলীক স্বপ্নের কথা বলিনি, আমি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলেছি।” তাঁর এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র চায়, তাদের কাছে তারেক রহমানের এই আধুনিক চিন্তাধারা অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
উপসংহার: জাতির প্রত্যাশা ও তারেক রহমানের স্বপ্ন আজ একবিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। দেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং পরিপক্ব নেতৃত্বের বিকল্প নেই। তারেক রহমানের “আমার একটি স্বপ্ন আছে” স্লোগানটি তখনই সফল হবে যখন তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার, অন্ন ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, এই স্বপ্ন কেবল রাজনীতির মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে নাকি এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে!#
.. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক