
বিশেষ প্রতিনিধি: হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতিকে জাগিয়ে রাখতে রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা নদীর পাড়ে বিপুল সমাগমের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তিন দিনব্যাপী নৌকা বাইচ উৎসব ও গ্রামীণ মেলা। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে জমকালো পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে এই বর্ণাঢ্য উৎসবের সফল সমাপ্তি ঘটে।
উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজার সংলগ্ন পদ্মা নদীতে এই বর্ণাঢ্য বাইচের আয়োজন করা হয়। আয়োজক কমিটি সূত্র জানায়, এবারের প্রতিযোগিতায় রাজশাহী ও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অর্ধশতাধিক নৌকা অংশ নেয়। বিজয়ীদের উৎসাহিত করতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে রাখা হয়েছিল ১ লাখ টাকার প্রাইজমানি।
বৃহস্পতিবার উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এস এম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ। নদীতে পিচবোর্ডে বসে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন এমপি চাঁদ।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আমাদের হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ধরনের সুস্থ বিনোদন ও সামাজিক আয়োজনে আমার পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

দুপুর গড়ালেই পদ্মার দুই পাড়ে ঢল নামে হাজার হাজার নারী-পুরুষের। কেউ পাড়ে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ নৌকায় চেপে নদীর ভেতর থেকে উপভোগ করেন উত্তেজনাকর এই বাইচ। কাঁসর-ঢোলের তালে তালে “নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে” গানের সুরে বৈঠা হাতে জলতরঙ্গে ছোটেন মাঝি-মাল্লারা।
প্রতিযোগিতায় ৭০ থেকে ৭৫ হাত লম্বা নৌকা নিয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ‘বাংলার বাঘ’ ও ‘জনতা এক্সপ্রেস’। নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের হুমায়ুন কবির ও হাফিজুর রহমান প্রতিযোগিতার জন্য নৌকা দুটি ভাড়ায় নিয়ে আসেন। মাঝিরা নদীতে নামার আগে মোনাজাত করে আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনা করেন। চোখধাঁধানো এই লড়াইয়ে চূড়ান্তভাবে প্রথম স্থান অর্জন করে ‘বাংলার বাঘ’।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে বাঘা, চারঘাট ও লালপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। নদী সংলগ্ন এলাকায় বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতল, গৃহস্থালি সামগ্রী, শিশুদের খেলনা ও মুখরোচক মিষ্টির পসরায় জমজমাট হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।
মেলায় আসা দর্শনার্থী মুনসুর রহমান বলেন, “গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে জাগাতে হলে আগে নদীকে বাঁচাতে হবে। নদী মরে যাওয়ায় আজ আমাদের লোকজ সংস্কৃতি হুমকির মুখে।”
খায়েরহাট গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আব্দুল লতিফ মন্ডল আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “২০২৩ সালের পর তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার মেলা হচ্ছে। এই নৌকা বাইচ দেখতে বাড়িতে মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়স্বজন এসেছে। এলাকাটি এখন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।”
আয়োজক কমিটির সভাপতি তোজাম্মেল হক জানান, নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব শিকড় ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুদ করিম টিপু, জাহিদুল ইসলাম স্বপন ও ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলম জনিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

বিশাল এই আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। সরেজমিনে দেখা যায়, তীব্র ঢেউ বা সংঘর্ষে নৌকা ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও কোনো নৌকায় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট বা উদ্ধার সরঞ্জাম ছিল না।
অভিজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে জানান, দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি নৌকার সঙ্গে একটি লম্বা, শক্ত রশি এবং তার মাথায় কয়েকটি খালি বোতল বা ভাসমান ড্রাম বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। এতে নৌকা ডুবে গেলেও প্লাস্টিকের বোতল বা ড্রাম পানির ওপরে ভেসে থাকবে, যা উদ্ধারকারীদের সহজে ডুবে যাওয়া নৌকার অবস্থান চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।#