_____ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম:
ইতিহাসের বাঁকগুলোতে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে, যারা প্রথাগত রাজনীতির ব্যাকরণ ভেঙে গণমানুষের হৃদস্পন্দনে পরিণত হন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে ওসমান হাদী ছিলেন তেমনই এক তেজস্বী নাম। রাজপথের জ্বালাময়ী বক্তৃতা থেকে শুরু করে টেলিভিশন টকশোতে যুক্তির তলোয়ারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা—সবখানেই তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল তাঁর সততা ও মাটির কাছাকাছি থাকা জীবনবোধ, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক ‘লিভিং লিজেন্ড’ করে তুলেছিল।
অভাবনীয় নির্বাচনী যুদ্ধ: ভ্যান ও রিকশার বিপ্লব ওসমান হাদীর নির্বাচনী প্রচারণা ছিল আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়। যেখানে প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা এবং দামী গাড়িবহরের মহড়া দিয়ে নির্বাচনে নামেন, সেখানে ওসমান হাদী নেমেছিলেন একেবারেই রিক্তহস্তে, কেবল জনগণের ভালোবাসা পুঁজি করে।
গণ-অর্থায়ন: তাঁর কোনো কর্পোরেট স্পন্সর ছিল না। এলাকার সাধারণ মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রেখেছিল। ২০ টাকা থেকে শুরু করে সাধ্যমতো লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়ে তাঁকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সাধারণ মেহনতি মানুষ। এটি ছিল জনগণের প্রকৃত ‘ওনারশিপ’ বা মালিকানার রাজনীতি।
বাহন যখন সাদাসিধে: তাঁর কোনো বিলাসবহুল গাড়ি ছিল না; তিনি ভ্যানে চড়ে পাড়ায় পাড়ায় প্রচার চালিয়েছেন। এমনকি যেদিন তিনি ঘাতকের বুলেটে বিদ্ধ হন, তখনও তাঁর বাহন ছিল সাধারণ মানুষের যান—একটি রিকশা। রিকশার ওপর থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর এই হামলা প্রমাণ করে যে, তিনি আমৃত্যু সাধারণ মানুষের কাতারে ছিলেন এবং ঘাতকরা তাঁর এই সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার শক্তিকেই ভয় পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ‘পলিটিক্যাল এলিমিনেশন’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখনই কোনো উদীয়মান নেতা তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসে বিদ্যমান ব্যবস্থার (The Establishment) ভিত নাড়িয়ে দেন, তখনই তিনি অদৃশ্য শক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ওসমান হাদীর উত্থান ছিল মূলত ‘পপুলিস্ট প্রোটেস্ট পলিটিক্স’-এর অংশ।
স্বার্থের সংঘাত: ঢাকা-৮ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীর বিপরীতে তাঁর লড়াই ছিল আসলে ‘ব্যালট বনাম মানি পাওয়ার’-এর লড়াই। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে একে বলা হয় ‘এলিট চ্যালেঞ্জিং পলিটিক্স’। যখন কোনো সাধারণ যুবক বড় শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দেয়, তখন তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন তিনি অনন্য ছিলেন? ওসমান হাদীর চরিত্রের প্রধান দিক ছিল ‘রাজনৈতিক নির্ভীকতা’ (Political Fearlessness)। ডেভিড বনাম গোলিয়াথ কমপ্লেক্স: তাঁর লড়াই ছিল বাইবেলের ডেভিড ও গোলিয়াথের গল্পের মতো। সীমিত সম্পদে অসীম সাহসের এই প্রদর্শন সাধারণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল যে, রাষ্ট্র সংস্কার কেবল বড়লোকদের কাজ নয়।
ক্যারিশম্যাটিক ও অর্গানিক লিডারশিপ: তাঁর বক্তৃতা সাধারণ মানুষের অবদমিত ক্ষোভকে শব্দ দিত। সাধারণ মানুষ তাঁর মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেত। এজন্যই তাঁর অসুস্থতায় দেশ-বিদেশের মানুষ আল্লাহর কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল। ইতিহাসের আয়নায় ওসমান হাদী ওসমান হাদীর এই লড়াইয়ের সাথে ইতিহাসের কিছু ঘটনার গভীর মিল রয়েছে।
মহাত্মা গান্ধী: যিনি বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন ও চলাফেরা করতেন। ওসমান হাদীর ভ্যান বা রিকশায় চড়ে প্রচার সেই আদর্শেরই প্রতিফলন।
টমাস শানকারা: আফ্রিকার এই বিপ্লবী নেতা রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও সাধারণ সাইকেলে চলতেন এবং সাধারণ মানুষের দান করা অর্থে রাষ্ট্র সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। তাঁকেউ বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছিল।
ম্যালকম এক্স: যাকে ঠিক একইভাবে জনগণের মাঝে থাকা অবস্থায় ঘাতকের বুলেটে জীবন দিতে হয়, কারণ তিনি প্রচলিত ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘাতকের উদ্দেশ্য ও পরবর্তী প্রভাব আততায়ীরা ভেবেছিল রিকশার ওপর থাকা এক যুবককে গুলি করে স্তব্ধ করে দিলেই সব শেষ। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি হিতে বিপরীত হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানে একটি কথা আছে— “The blood of the martyrs is the seed of the revolution”। একজন ‘জীবিত হাদী’র চেয়ে একজন ‘শহীদ হাদী’ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। ২০ টাকা চাঁদা দেওয়া সেই রিকশাচালক বা সাধারণ মানুষটি এখন তাঁর এই ত্যাগের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের নতুন মন্ত্র খুঁজে পাবে।
উপসংহার: ওসমান হাদী চলে গেছেন পরম করুণাময়ের সান্নিধ্যে, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন একটি নতুন ধারার রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন। রিকশার ওপর তাঁর রক্তাক্ত নিথর দেহটি আসলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র। তবে তাঁর এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে থাকবেন সেই নেতা হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছেন—রাজনীতি মানে টাকা বা গাড়ি নয়, রাজনীতি মানে রিকশার সিটে বসে মানুষের হৃদয়ে আসন পাতা। ওসমান হাদী চব্বিশের চেতনা ও ইনকিলাব মঞ্চের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। @ ”বিপ্লবের রাজপুত্র ‘হাদী’, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো? আজ তোমার শূন্যতায় শুধু একটি জনপদ নয়, বরং পুরো দেশ এবং সারা বিশ্বের বিবেক জেগে উঠেছে। ঘাতকের বুলেট তোমাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা জানে না—কিছু মৃত্যু জীবনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়। তুমি হারোনি হাদী, তুমি জিতে গেছো। ঘাতকদের পরাজয় হয়েছে তোমার ওই নিথর দেহের সাহসের কাছে।”#
# লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক