______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: পৃথিবীর নানা প্রান্তে ধর্মকে প্রায়শই এক দুর্বোধ্য এবং কঠোর বিধিনিষেধের সমাহার হিসেবে দেখা হয়। অনেকেই মনে করেন, ধর্ম সাধারণ জীবনযাত্রায় জটিলতার সৃষ্টি করে। তবে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রচলিত ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ভুল। ইসলাম মানবজীবনের জন্য কোনো জটিল জালের সৃষ্টি করেনি, বরং এটি বিশ্বস্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত এক সরল পথের দিশারী। ইসলাম হলো জীবন পরিচালনার এক পরিপূর্ণ ও সহজ সরল বিধান, যা সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়—কোথায় মানুষকে ‘থামতে’ হবে (বিরত থাকতে হবে) এবং কোথায় ‘চলতে’ হবে (এগিয়ে যেতে হবে)। এই নিবন্ধে ইসলামী শিক্ষার আলোকে ধর্মের এই সরলতা ও সঠিক পথে পরিচালনার ভূমিকাটি বিশ্লেষণ করা হবে।
১. জটিলতার আবরণ ভেদ ও সরলতার প্রতি গুরুত্ব পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। এটিই ইসলামের মৌলিক স্পিরিট এবং মূলনীতি। চলতে হবে: ইসলাম মানুষকে জীবনের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ) -এর সহজতম পথে চলতে শেখায়, যা জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই পথ মানুষকে উদ্দেশ্যপূর্ণ ও অর্থবহ জীবন দান করে। থামতে হবে: মিথ্যা, জুলুম, অবিচার, অশ্লীলতা ও অহংকারের পথ থেকে বিরত থাকতে বা ‘থামতে’ শেখায়। এটি কোনো কঠিন বিধি-নিষেধ নয়, বরং জীবনের পথে তৈরি হওয়া নৈতিক পতন, জটিলতা ও বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা।
২. জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে সহজ নির্দেশনা ইসলামী জীবনবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব হলো এটি কেবল ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত থেকে শুরু করে মুআমেলা (লেনদেন) ও মুআশেরা (সামাজিকতা)—এই সকল ক্ষেত্রে যাপিত জীবনে মানুষকে স্থান, কাল ও পাত্র বিচার করে সহজ পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
ইবাদতে নমনীয়তা: অসুস্থতা বা সফরের কারণে রোজা কাজা করার সুযোগ, নামাজের ক্ষেত্রে কসর করার বিধান এবং শারীরিক সক্ষমতা না থাকলে হজের বাধ্যবাধকতা না থাকা—এগুলো প্রমাণ করে ইসলাম কোনো কঠিন বোঝা চাপিয়ে দেয়নি। এটিই প্রমাণ করে যে ইসলাম তার অনুসারীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সরলতা: ব্যবসা-বাণিজ্যে সুদকে হারাম করা হয়েছে (যা সমাজে অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি করে) এবং হালাল ও সৎ ব্যবসাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ (আল-ওয়াসাতিয়্যাহ) অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সহজ ও সরল করে।
৩. সঠিক পথের দিশারী (সিরাতুল মুস্তাকিম) ইসলামী পরিভাষায় এই সরল, সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ পথই হলো ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ (সঠিক পথ)। এটি কেবল পরকালের মুক্তির পথ নয়, বরং দুনিয়ার জীবনের প্রতি পদে চলার এক স্পষ্ট রেখাচিত্র। ধর্ম মানুষকে একটি নৈতিক কম্পাস সরবরাহ করে, যা হালাল-হারামের সীমারেখা টেনে দেয়। এই জ্ঞানের ফলেই মানুষ জানতে পারে কখন ও কোথায় থামতে হবে এবং কখন ও কোথায় চলতে হবে। এটি জীবনের উদ্দেশ্য ও পথের দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
৪. জ্ঞান অর্জন ও পথের দিশা যেহেতু ধর্ম মানুষকে জীবনের জটিলতা থেকে সরিয়ে সরল পথের সন্ধান দেয়, তাই এই সুবিধা পুরোপুরি পেতে হলে আমাদের দরকার ধর্মের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে জ্ঞান অর্জন করা। জ্ঞান হলো সেই আলো, যা ছাড়া সরল পথও অন্ধকার মনে হতে পারে। ইবাদত ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে ইসলাম যে নমনীয়তা বা ছাড় দিয়েছে, সেই জ্ঞান না থাকলে আমরা হয়তো ভুলভাবে সেগুলোকে কঠিন মনে করব। সঠিক জ্ঞানই আমাদের শেখায়, কখন ও কোথায় সেই স্থান, কাল ও পাত্রের ভিত্তিতে বিধানকে প্রয়োগ করতে হবে।
উপসংহার: অতএব, এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ধর্ম মূলত কোনো জটিলতা সৃষ্টিকারী নয়, বরং এটি সঠিক পথের এক অনন্য দিশারী। ইসলামী জীবনদর্শন মানুষকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ইহকাল ও পরকালের সাফল্য অর্জনের জন্য একটি সহজ, স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রদান করে। সিরাতুল মুস্তাকিম-এর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আমরা এর সরলতাকে পুরোপুরি অনুভব করতে পারি এবং জীবনের নানা জটিলতা দূর করে ইসলামী সরল পথে এক অনাবিল প্রশান্তি ও সফলতা খুঁজে পেতে পারি।#
## লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক