— ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন হলো জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক বা জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এটি মূলত একটি রাজনৈতিক উৎসব। এই উৎসবে প্রার্থীরা তাদের দলের আদর্শ, ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের দ্বারস্থ হন। ব্যানার, ফেস্টুন, গীতধর্মী প্রচারণা আর যুক্তিনির্ভর বক্তৃতায় মুখরিত হওয়ার কথা পুরো জনপদ। একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই যোগ্য নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে—এটাই গণতন্ত্রের মূল কথা। কিন্তু যখন এই উৎসবে হিংসা ও সহিংসতার প্রবেশ ঘটে, তখন তা কেবল নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পুরো জাতির নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। উৎসবমুখর নির্বাচনের স্বরূপ নির্বাচন মানেই হবে প্রাণবন্ত প্রচারণা। ভোটারদের মন জয়ের জন্য প্রার্থীরা বিভিন্ন সৃজনশীল পথ বেছে নেবেন:
সাংস্কৃতিক প্রচারণা: ছন্দে ছন্দে শ্লোগান, প্রার্থীর গুণগান সম্বলিত গান এবং লোকজ ঐতিহ্যের মাধ্যমে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ।
সুস্থ কৌশল: এক পক্ষ অন্য পক্ষের নীতি বা কাজের সমালোচনা করবে এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। এটি একটি মেধা ও জনপ্রিয়তার লড়াই।
গণসংযোগ: ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিনয়ের সাথে ভোট প্রার্থনা করা, যা প্রার্থীর সাথে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। জনগণ এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করে যেখানে ভীতিহীনভাবে তারা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে।
সহিংসতার আঘাত: একটি পরিসংখ্যানিক চিত্র নির্বাচনী মাঠ যখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যায়। প্রতিপক্ষকে দমনের মানসিকতা থেকে সৃষ্ট সংঘাতের ভয়াবহতা নিচে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
১. শারীরিক সংঘাত: জীবনহানি, পঙ্গুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক ট্রাজেডি। ২. সম্পত্তি ধ্বংস: নির্বাচনী অফিস পোড়ানো, গাড়ি ভাঙচুর ও ব্যক্তিগত জানমালের ক্ষতি। ৩. মানসিক ভীতি: সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, যা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতিকে কমিয়ে দেয়। ৪. সামাজিক বিভেদ: আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরায়, যা নির্বাচনের পরেও দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা আমরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে সহনশীলতার অভাব প্রকট।
সুস্থ রাজনীতি একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। কিন্তু পেশিশক্তির ব্যবহার এই প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। প্রার্থীরা যখন জনসেবার চেয়ে ক্ষমতা দখলকে বড় করে দেখেন, তখনই সংঘাতের পথ বেছে নেন। অথচ একজন প্রকৃত নেতার মূল শক্তি হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা। উত্তরণের পথ সহিংসতা মুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন: ১.
রাজনৈতিক সহনশীলতা: প্রতিপক্ষকে শত্রু না ভেবে প্রতিযোগী হিসেবে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তোলা। ২. আইনের শাসন: অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ৩. ভোটার সচেতনতা: সহিংস প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করার মতো নৈতিক সাহস জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া।
উপসংহার: নির্বাচন কোনো যুদ্ধ নয়, বরং এটি জনসেবার সুযোগ পাওয়ার একটি পরীক্ষা মাত্র। রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠে জয়ী হওয়ার মাঝে কোনো গৌরব নেই। আমাদের রাজনীতিতে শুদ্ধতা প্রয়োজন। আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে ব্যালট পেপারে কোনো রক্তের দাগ থাকবে না; যেখানে জয়ী ও বিজিত প্রার্থী একে অপরের হাত ধরে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবেন। তবেই সার্থক হবে গণতন্ত্রের এই মহোৎসব!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক