____ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইতিহাসের কোনো নেতাই রাতারাতি তৈরি হন না; বরং সময়ের দাবি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে এক একজন প্রকৃত জননেতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান এমন একটি নাম, যিনি গত দুই দশকে অসংখ্য চড়াই-উতরাই, সমালোচনা এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়েছেন। এক সময় যাকে নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল, সেই ‘অপরিপক্ক’ ইমেজের তারেক রহমান আজ তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একজন ‘পরিপক্ক’ রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। তার এই বিবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন বাঁক বদলের গল্প।
ঐতিহাসিক পরিক্রমা: অভিজ্ঞতার কঠিন পাঠশালা তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শেষে তৃণমূল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে। ২০০১ পরবর্তী সময়ে তার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সেই সময়কার কিছু সিদ্ধান্ত ও কৌশলকে অনেকে রাজনৈতিক ‘অপরিপক্কতা’ হিসেবে গণ্য করতেন। কিন্তু ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন তাকে এক নতুন জীবনদর্শন শিখিয়েছে। বিদেশে অবস্থানকালীন দীর্ঘ দেড় দশক তিনি নিভৃতে বিশ্বরাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, নিজের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করেছেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়টি ছিল তার জন্য একটি ‘মৌন বিপ্লব’। জেল-জুলুম, শারীরিক নির্যাতন এবং সুদূর প্রবাসে থেকে দল পরিচালনা করার কঠিন চ্যালেঞ্জই তাকে আজ একজন ধীরস্থির ও মিতবাক নেতায় রূপান্তরিত করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রতিকূলতা একজন নেতাকে ধ্বংস করে না, বরং ইস্পাতকঠিন করে গড়ে তোলে।
ভাতা প্রত্যাখ্যান: এক নৈতিক ও বৈপ্লবিক অবস্থান সম্প্রতি তারেক রহমানের একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যখন একজন দলীয় কর্মী দাবি করেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে নির্যাতিত নেতাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, তখন তারেক রহমান তা সরাসরি ও অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে নাকচ করে দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন— “কোন আইনে এটা দেওয়া সম্ভব? স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রের টাকা দলের পেছনে খরচ করেছে; আমরাও যদি তাই করি, তবে তাদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?”
এই একটি অবস্থান থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়: আইনের শাসন: তিনি আইনের বাইরে গিয়ে কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে বিশ্বাসী নন।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের পবিত্রতা: জনগণের ট্যাক্সের টাকা কেবল জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়—এই বোধটি একজন রাষ্ট্রনায়কের অন্যতম গুণ।
সংস্কৃতির পরিবর্তন: তিনি বাংলাদেশে প্রচলিত ‘লুটতরাজ ও ভাগ-বাটোয়ারার রাজনীতি’র আমূল পরিবর্তন চান। তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও সাংগঠনিক আধুনিকায়ন তারেক রহমানের পরিপক্কতার অন্যতম বড় উদাহরণ হলো বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোকে নতুন করে সাজানো। তিনি গতানুগতিক ড্রয়িংরুম রাজনীতি থেকে দলকে বের করে এনে তৃণমূলের কর্মীদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সম্মেলনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করার যে সংস্কৃতি তিনি চালু করেছেন, তা দেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। তিনি বুঝেছেন যে, উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতৃত্ব নয়, বরং তৃণমূলের সমর্থনই একটি দলকে শক্তিশালী করতে পারে। প্রযুক্তি ও আগামীর বাংলাদেশ নির্বাসনে থেকেও তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি’ তৈরি করেছেন। জুম মিটিং এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রতিটি প্রান্তের নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। এটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি তার নেতৃত্বের এক নতুন মাত্রা। তিনি প্রযুক্তিবান্ধব তরুণ প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারছেন এবং তাদের স্বপ্নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনা দিচ্ছেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা: এক আধুনিক সনদ তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্কতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার উপস্থাপিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখায়। এতে তিনি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসনের আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছেন। তিনি দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং একই ব্যক্তির দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের এক যুগান্তকারী চিন্তা। এই প্রস্তাবনাগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত অবস্থান বিগত বছরগুলোতে তারেক রহমান বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। তিনি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বুঝে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ একটি পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছেন। উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: নতুনের কেতন অতীতের ভুলগুলোকে স্বীকার করে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো ম্যাচিউরিটি। তারেক রহমান আজ আর আবেগী কোনো তরুণ নেতা নন; তিনি এখন একজন ঠান্ডা মাথার কৌশলী। দলের কর্মীদের উগ্রতা পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রমাণ করে যে, তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে বেশি আগ্রহী।