ভূমিকা বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটকদের কাছে এটি কেবল একটি বিনোদন কেন্দ্র হলেও, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিচারে এর রয়েছে এক গভীর পটভূমি। টেকনাফ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপটি হাজার বছর ধরে যেমন ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তেমনি এর নাম ও জনবসতির ইতিহাসে রয়েছে নানা বাঁকবদল।
প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটি বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অনন্য গুরুত্ব বহন করে। ঐতিহাসিক পটভূমি ও নামকরণ সেন্টমার্টিন দ্বীপের আদি নাম ছিল ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’। লোককথা অনুযায়ী, আরব বণিকরা এই পথে যাতায়াতের সময় নারিকেল চারা রোপণ করেছিলেন, যা থেকে এই নামটির উৎপত্তি। তবে ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯০০ সালের দিকে ব্রিটিশ আমলে ভূ-জরিপের সময় চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার মার্টিনের নামানুসারে এর নাম রাখা হয় ‘সেন্টমার্টিন’।
ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে টেকনাফের মূল ভূখণ্ড থেকে চ্যুতি বা ফাটলের ফলে এটি একটি স্বতন্ত্র দ্বীপে পরিণত হয়। স্থানীয়রা একে বর্তমানে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নামেও অভিহিত করে থাকেন।
ছেঁড়াদ্বীপ: সৌন্দর্যের আধার ও ভ্রমণের সীমাবদ্ধতা সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ প্রান্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘ছেঁড়াদ্বীপ’, যা মূলত ৫-৬টি ছোট দ্বীপের সমষ্টি। জোয়ারের সময় পানি বেড়ে গিয়ে মূল দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলেই এর এমন নামকরণ। এটি মূলত মৃত প্রবালের এক বিস্ময়কর স্তূপ।
তথ্যমতে, এই দ্বীপে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল এবং ১৫৭ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে পরিবেশগত সংকটের কারণে সরকারিভাবে এখানে পর্যটক ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে, ছেঁড়াদ্বীপ ভ্রমণে এই নিষেধাজ্ঞা ভ্রমণকারীদের জন্য একটি গভীর কষ্টের কারণ। বহু মানুষ কেবল এই অনন্য প্রবালরাজির ছোঁয়া পেতে মাইলের পর মাইল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসেন। প্রকৃতির একদম অন্তঃস্থলে যাওয়ার এই সুযোগ হারানো পর্যটকদের মনে এক ধরনের অপূর্ণতা তৈরি করে। কিন্তু ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ বলছে, গত কয়েক দশকে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত পদভারে এখানকার প্রবালস্তর আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। পর্যটকদের এই সাময়িক কষ্ট আসলে দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপটিকে বিলীন হওয়ার হাত থেকে টিকিয়ে রাখারই একটি অনিবার্য ত্যাগের অংশ।
পরিবেশগত সংকট ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ পর্যটক এই দ্বীপে যাতায়াত করেন, যার ধারণক্ষমতা আসলে অনেক কম। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে দ্বীপের মিষ্টি পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এছাড়াও লোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে নারিকেল গাছসহ স্থানীয় গাছপালার বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। প্রবাল আহরণ ও অতিরিক্ত শব্দ দূষণের ফলে সামুদ্রিক কাছিমদের প্রজনন ক্ষেত্র আজ হুমকির মুখে।
উপসংহার: সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপের ইতিহাস আমাদের অভিযোজন ও প্রকৃতির বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। ছেঁড়াদ্বীপে যেতে না পারার বেদনা থাকলেও, আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রকৃতি টিকে থাকলেই আমাদের ভ্রমণ সার্থক হবে। ঐতিহাসিক এই পর্যবেক্ষণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহযোগিতা করা। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই নীল জলরাশির কাব্যকে রক্ষা করাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক