
___ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবেই ‘আলোকবর্তিকা’র মতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা এক অস্থির ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাগুলো যেমন গর্হিত ও অনৈতিক, তেমনি এর নেপথ্যের কারণগুলোও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শিক্ষক অন্যায় করলে ছাত্রের আইন হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, তবে কেন আজ শিক্ষকের সেই পবিত্র আসনটি নড়বড়ে হয়ে পড়ল, সেই আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে।
সম্পর্কের ব্যবধান: ‘সর্বজনীন’ থেকে ‘আংশিক’ শিক্ষক অতীত ও বর্তমানের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে শিক্ষকের সর্বজনীনতায়।
অতীতের শিক্ষক: শিক্ষকরা ছিলেন শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান অভিভাবক। তাঁদের কাছে ছাত্রের পরিচয় ছিল কেবলই ‘শিক্ষার্থী’। তাঁদের মমতা ও শাসন ছিল সবার জন্য সমান।
বর্তমান বাস্তবতা: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, শিক্ষক এখন আর সবার নন, বরং তিনি আংশিক শিক্ষার্থীর—অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট দলীয় বা আদর্শিক বলয়ের। শিক্ষক যখন নিজ পেশার চেয়ে দলীয় পরিচয় বা হীন স্বার্থকে বড় করে দেখেন, তখন তিনি বাকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারান। এই বিভাজনই শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষকের প্রতি থাকা চিরন্তন শ্রদ্ধাবোধকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকট শিক্ষক যখন তাঁর পেশাগত গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বের বিষয়টি ভুলে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি ঝুঁকে পড়েন, তখনই তাঁকে এই অপমানের গ্লানি বরণ করতে হয়। এটি সমগ্র শিক্ষক সমাজের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। রাজনীতিকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষা আজ কেবল পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শিক্ষকের আদর্শিক অবস্থান গৌণ হয়ে পড়েছে।
উত্তরণের পথ: বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা এই সংকটময় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিম্নলিখিত পথে হাঁটতে হবে:
১. শিক্ষক সত্তার পুনর্জাগরণ: শিক্ষককে দলীয় বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় ‘সর্বজনীন’ হয়ে উঠতে হবে। ক্লাসরুমের প্রতিটি ছাত্র যেন অনুভব করে যে তাদের শিক্ষক কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়, বরং সবার পরম আশ্রয়স্থল।
২. পেশাগত নিরপেক্ষতা: শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে মেধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। শিক্ষককে হতে হবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক অনন্য চারিত্রিক সত্তা।
৩. নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ: শিক্ষক সমাজকে নিজেদের জন্য একটি কঠোর নৈতিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যারা ব্যক্তিগত স্বার্থে শিক্ষকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজকেই প্রথম সোচ্চার হতে হবে।
৪. সুস্থ পরিবেশ ও জবাবদিহিতা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি মুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষক অন্যায় করলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার যোগ্য মনে না করে।
উপলব্ধি: একটি যন্ত্রণাদায়ক সত্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এই টানাপোড়েন আমাদের একটি কঠিন উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—”সম্মান দাবি করে পাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয়।” শিক্ষক যখন আদর্শচ্যুত হন, তখন তিনি কেবল ব্যক্তি হিসেবে হারেন না, বরং পুরো শিক্ষক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী যখন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে, তখন সে আসলে নিজের এবং সমাজের ভবিষ্যতের মূলে কুঠারাঘাত করে।
উপসংহার: শিক্ষক অন্যায় করলে ছাত্রের গায়ে হাত তোলার অধিকার নেই—এটি যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনি শিক্ষককে মনে রাখতে হবে তাঁর সম্মান তাঁর নিজেরই হাতে। শিক্ষক যদি তাঁর দলীয় বা হীন স্বার্থ ত্যাগ করে পুনরায় প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের উচ্চাসনে আসীন হন, তবে কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে তাঁর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমাদের লক্ষ্য হোক এমন এক সমাজ গঠন করা, যেখানে শিক্ষক হবেন সবার এবং ছাত্র হবে বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল!#
… লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক