
_____ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে পরিবার হলো আদি সংগঠন। ইসলামে বিবাহকে একটি পবিত্র চুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বা সালিশি পরিষদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতের কিছু পর্যবেক্ষণ এবং আইনি বিতর্কে এই অনুমতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ইসলামী দর্শন, রাষ্ট্রীয় আইন এবং ব্যক্তিগত সক্ষমতার এই মেলবন্ধনে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ।
আইনি বর্তমান অবস্থা ও হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ : বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রথম স্ত্রীর বর্তমান থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায়, তবে তাকে সালিশি পরিষদের কাছে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। এই আইন লঙ্ঘন করলে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাইকোর্টের বিভিন্ন পর্যালোচনায় দুটি প্রধান দিক উঠে এসেছে:
বিবাহের বৈধতা: অনুমতি না নিয়ে বিবাহ করলে সেটি দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে, কিন্তু বিবাহটি ‘বাতিল’ বা ‘অবৈধ’ হয়ে যায় না। অর্থাৎ, ধর্মীয় রীতি মেনে সম্পন্ন হওয়া বিবাহটি আইনত কার্যকর থাকে।
অধিকার রক্ষা: আদালত মূলত গুরুত্ব দিচ্ছে প্রথম স্ত্রীর অধিকার এবং সন্তানদের ভরণপোষণের ওপর। আইন জারি করার মূল উদ্দেশ্য বিবাহ রোধ করা নয়, বরং প্রথম স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জীবন দর্শন ও সক্ষমতার মাপকাঠি : বিষয়টিকে একটি বাস্তবমুখী উপমার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। বাজারে একটি পণ্য নেই বলে হাহাকার ছিল, এখন সেটি বাজারে এসেছে—তার মানেই এই নয় যে পণ্যটি দেখেই আমাকে লাফাতে হবে। পণ্যটি কেনার আগে যেমন নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা ভেবে দেখতে হয়, দ্বিতীয় বিবাহের বিষয়টিও অনুরূপ। আইন বা সুযোগ থাকা মানেই তা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয়। বরং এর জন্য প্রয়োজন, আর্থিক সক্ষমতা: একাধিক পরিবারের আজীবন ভরণপোষণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা। মানসিক দৃঢ়তা: একাধিক স্ত্রীর মধ্যে আবেগ ও সময়ের সুষম বণ্টন করার ধৈর্য।
বিবেচনাবোধ: সুযোগের চেয়ে সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইসলাম কী বলে, ইসলামী দর্শনের আলোকপাত ইসলামী শরিয়াহ এবং দর্শনের মূলে রয়েছে ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা কঠোর শর্তসাপেক্ষ। ন্যায়বিচারের শর্ত (Justice): কোরআন স্পষ্টভাবে বলেছে, “যদি তোমরা ভয় করো যে তাদের (স্ত্রীদের) মধ্যে সমতা রক্ষা করতে পারবে না, তবে একটিই বিবাহ করো।” ইসলামী দর্শনে আর্থিক, শারীরিক এবং মানসিক—সব ক্ষেত্রেই স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা ফরয।
অনুমতির প্রয়োজনীয়তা: মূল ইসলামী বিধিবিধান অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর সরাসরি অনুমতি নেওয়া ‘ফরয’ বা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ, অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বিয়ে ভেঙে যাবে না। তবে স্ত্রীর সাথে আলোচনা করা এবং তাকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করা ‘ইহসান’ বা উত্তম আচরণের অন্তর্ভুক্ত।
রাষ্ট্রীয় আইনের সম্মান: ইসলামী দর্শনে ‘উলিল আমর’ বা রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক আইন মেনে চলা আবশ্যক। যদি রাষ্ট্র বিশৃঙ্খলা রোধে বা নারীর অধিকার রক্ষায় কোনো নিয়ম জারি করে, তবে নাগরিক হিসেবে তা পালন করাও ধর্মীয় শৃঙ্খলার অংশ। ইসলামী দর্শন বনাম প্রচলিত বিতর্ক ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, দ্বিতীয় বিবাহ কেবল লালসা চরিতার্থ করার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সমাধান (যেমন: বিধবা বা এতিমদের আশ্রয়)। কিন্তু যদি কেউ প্রথম স্ত্রীর হক নষ্ট করে বা জুলুম করে দ্বিতীয় বিবাহ করে, তবে ইসলামী দর্শনে সেই ব্যক্তি গুনাহগার হিসেবে গণ্য হবেন।
উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ বা রাষ্ট্রীয় আইন মূলত নাগরিক শৃঙ্খলা ও নারীর অধিকার রক্ষার একটি ঢাল। যদিও ধর্মীয় দৃষ্টিতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বিবাহের বৈধতার শর্ত নয়, তবুও পারিবারিক শান্তি এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে এটি অত্যন্ত জরুরি!#
.. # লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক।#