ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: মানবজাতিকে আল্লাহ তাআলা সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন এবং তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আমানত হিসেবে দান করেছেন। এই আমানতের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সুস্থতা বজায় রাখা প্রত্যেক মুমিনের ধর্মীয় দায়িত্ব। বর্তমান বিশ্বে জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হলো তামাক। আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত বিভাজন লক্ষ্য করা যায়—আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণির বড় একটি অংশ সিগারেটে অভ্যস্ত, অন্যদিকে মাদরাসা কেন্দ্রিক ধর্মীয় সমাজের একাংশের মধ্যে জর্দা, গুল বা তামাকপাতা ব্যবহারের প্রবণতা প্রকট। এই নিবন্ধে জর্দা সেবনের ধর্মীয় বিধান এবং এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। জর্দা ও তামাকের রাসায়নিক প্রকৃতি জর্দা মূলত তামাকেরই একটি প্রক্রিয়াজাত রূপ। এতে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড এবং টার-এর মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়াবিহীন তামাক বা জর্দায় সিগারেটের চেয়েও বেশি মাত্রায় কার্সিনোজেন (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) থাকতে পারে। এটি সরাসরি রক্তে মিশে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী আসক্তি তৈরি করে। ইসলামের আলোকে জর্দা সেবনের বিধান ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে কোনো নতুন বস্তুর বিধান চারটি মূলনীতির আলোকে নির্ধারিত হয়। জর্দার ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো নিম্নরূপ:
১. ক্ষতিকর প্রভাব (Self-Harm): কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে, “তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না” (সূরা নিসা: ২৯)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, জর্দা মুখগহ্বর, কণ্ঠনালী এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারের প্রধান কারণ। যেহেতু এটি নিশ্চিতভাবে শরীরের ক্ষতি করে, তাই একে বৈধ বলার অবকাশ নেই।
২. দুর্গন্ধ ও অপবিত্রতা (Foul Odor): ইসলাম পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ধর্ম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।” জর্দা সেবনের ফলে দাঁতে কালো দাগ পড়ে এবং মুখে উৎকট দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এতে ফেরেশতারা কষ্ট পায় এবং জামাতে নামাজ পড়ার সময় পাশের মুসল্লির একাগ্রতা নষ্ট হয়। রাসূল (সা.) কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন, যার ভিত্তি হলো দুর্গন্ধ। জর্দার দুর্গন্ধ তার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র।
৩. অপচয় ও অনর্থক ব্যয় (Extravagance): জর্দা কোনো খাদ্য নয় এবং এতে শরীরের কোনো পুষ্টিও হয় না। শরিয়তের দৃষ্টিতে যে ব্যয়ের কোনো দুনিয়াবি বা পরকালীন উপকার নেই, তা ‘তাবজির’ বা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সূরা বনী ইসরাইল: ২৭)।
৪. নেশা ও আসক্তি (Addiction): যদিও জর্দা সরাসরি মদ বা হিরোইনের মতো জ্ঞান লোপ করে না, কিন্তু এটি এক ধরনের স্নায়বিক আসক্তি তৈরি করে। ইসলামি মূলনীতি অনুযায়ী, যা মানুষকে কোনো ক্ষতিকর অভ্যাসে দাসে পরিণত করে, তা থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়।
মাদরাসা শিক্ষিত সমাজ ও জর্দা: একটি সামাজিক সংকট সমাজে আলেম সমাজকে ‘নবীগণের ওয়ারিস’ বা উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। তাদের প্রতিটি কাজ সাধারণ মানুষের জন্য অনুসরণীয়। যখন কোনো আলেম বা মাদরাসা শিক্ষিত ব্যক্তি প্রকাশ্যে জর্দা খান, তখন সাধারণ মানুষের কাছে কয়েকটি ভুল বার্তা যায়: সিগারেটের বৈধতা খোঁজা: সাধারণ মানুষ মনে করে, “হুজুররা যদি জর্দা খেতে পারেন, তবে আমরা সিগারেট খেলে ক্ষতি কী?” মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়া: আলেমদের থেকে মানুষ তাকওয়া এবং পরিচ্ছন্নতা আশা করে। জর্দা সেবনকারী ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সাধারণের চোখে খাটো হয়ে যায়।
অমুসলিম বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের সমালোচনা: এটি ইসলামের পরিচ্ছন্নতার দাওয়াতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপাত্ত ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC)-এর মতে, জর্দা বা তামাক সরাসরি ‘গ্রুপ-১ কার্সিনোজেন’। বাংলাদেশে প্রতি বছর জর্দা ও তামাক ব্যবহারের ফলে লক্ষাধিক মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করে। বিশেষ করে জর্দার কারণে ‘ওরাল সাব-মিউকাস ফাইব্রোসিস’ নামক রোগ হয়, যাতে মানুষের মুখ খোলার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। প্রতিকার ও বর্জনের উপায়
১. সচেতনতা: জর্দা যে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ধর্মীয়ভাবে অপছন্দনীয় (মাকরূহ), এ বিষয়ে মাদরাসাগুলোতে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
২. বিকল্প অভ্যাস: জর্দার আসক্তি কাটাতে লবঙ্গ, এলাচ বা আদা কুচি ব্যবহারের অভ্যাস করা যেতে পারে।
৩. সামাজিক প্রতিরোধ: ধর্মীয় সভা ও মাহফিলগুলোতে তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার ডাক দেওয়া উচিত।
উপসংহার: ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা মানুষের কল্যাণ কামনা করে। তামাক বা জর্দা মানুষের শারীরিক, আর্থিক এবং আত্মিক—তিন দিক দিয়েই ক্ষতি সাধন করে। তাই সাধারণ শিক্ষিত বা মাদরাসা শিক্ষিত, ভেদাভেদ ভুলে সমাজ থেকে এই তামাকের অভিশাপ দূর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ধর্মীয় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের জর্দা বর্জনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও উন্নত সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তাকওয়া কেবল পোশাকে নয়, বরং কলুষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনচর্চাতেও প্রতিফলিত হয়!#
…. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক