
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম ।
ভূমিকা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে “অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ” নির্বাচন একটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য—যেখানে তিনি পুলিশ বাহিনীকে শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন—তা জাতির মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কেবল ঘোষণা বা মহড়াই যথেষ্ট নয়; জাতি এখন এই কথার বাস্তব এবং দৃশ্যমান প্রয়োগ দেখতে চায়।
পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের রক্ষক নয়, বরং জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রের কর্মচারী। সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সেই জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।
পেশাদারিত্বের মানদণ্ড: নির্বাচনে প্রায় ১ লক্ষ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই প্রশিক্ষণের সার্থকতা নির্ভর করবে যখন মাঠ পর্যায়ের একজন কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই কোনো প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার না করে কাজ করবেন।
নিরপেক্ষতার চ্যালেঞ্জ: বিগত বছরগুলোতে দলীয়করণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে একটি “মানবিক ও সাহসী” পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তথ্য ও উপাত্তের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতি সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ৪১তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের বড় একটি অংশ (৯৬ জন প্রশিক্ষণার্থী) কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ: প্রায় ১ লক্ষ পুলিশ সদস্যকে নির্বাচনী নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
সতর্কবার্তা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরণের “অনৈতিক সুবিধা বা আপ্যায়ন” গ্রহণ করা যাবে না। এটি সরাসরি দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান।
রিটার্নিং অফিসারের সমন্বয়: ভোটকেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে রিটার্নিং অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ নির্দেশ করে।
ঘোষণার মহড়া বনাম বাস্তবতা: জনগণের প্রত্যাশা জাতি কেন কেবল ঘোষণায় তুষ্ট নয়, তার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
১. আস্থার সংকট: অতীতেও অনেকবার এ ধরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের দিন পেশাদারিত্বের পরিবর্তে পক্ষপাতিত্বের চিত্র দেখা গেছে।
২. চাপ মোকাবিলা: পেশাগত জীবনে নানা চাপ ও সমালোচনা আসবে—উপদেষ্টার এই সতর্কবার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশপ্রেম ও সততা থাকলে এই চাপ জয় করা সম্ভব।
৩. নিরাপত্তার নিশ্চয়তা: ভোটাররা যেন নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করাই হবে পুলিশের আসল সাফল্য।
উপসংহার: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য একটি ইতিবাচক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ার প্রাথমিক ধাপ। তবে এই “ঘোষণার মহড়া” যেন কেবল ভাষণে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ বাহিনীকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা আসলেই জনগণের সেবক। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার মাধ্যমে যদি পুলিশ বাহিনী জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে, তবেই এই মহড়া ও প্রশিক্ষণ সার্থক হবে। জাতি কোনো অজুহাত নয়, বরং ব্যালট বাক্সে তাদের রায়ের সঠিক প্রতিফলন এবং একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের শতভাগ বাস্তব রূপ দেখতে চায়।#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক