__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
সমাজকে আলোকিত করার কারিগরদের আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করতে পারি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। যখন কোনো মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন চারদিকে শোকের ছায়া নামে, আয়োজন করা হয় স্মরণসভার, প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সম্মান, এই শ্রদ্ধাবোধ কি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করা যেত না?
রাজশাহী তথা সমগ্র দেশের সাহিত্য ও শিক্ষা অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক এবং সাবেক অধ্যক্ষ ড. তসিক ইসলাম রাজা-র চলে যাওয়া আমাদের সমাজের এক গভীর সত্যকে উন্মোচন করেছে। তাঁর প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা গুণী মানুষের কদর করতে বড্ড দেরি করে ফেলি। ড. তসিক ইসলাম রাজা: একটি সর্বজনবিদিত নাম রাজশাহী শহরের প্রতিটি ধূলিকণায় এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে ড. তসিক ইসলাম রাজা ছিলেন একটি শ্রদ্ধেয় এবং সুপরিচিত নাম। একজন সফল শিক্ষাবিদ ও সাবেক অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি হাজারো তরুণ প্রাণকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। একই সাথে একজন সাহিত্যিক ও গবেষক হিসেবে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী এবং চিন্তাভাবনা আমাদের মননশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি শুধু একটি নাম ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি নীরব আলোকবর্তিকা।
জীবদ্দশায় অবহেলা এবং শ্রদ্ধার দুর্ভিক্ষ বেঁচে থাকতে সম্মানটা জানালে ভালো হতো না? প্রিয় মানুষগুলোকে এভাবে বিদায় দেওয়া আমাদের শ্রদ্ধার দুর্ভিক্ষ ছাড়া আর কী বলতে পারি। ড. তসিক ইসলাম রাজা বেঁচে থাকতে তাঁকে সম্মানিত করে কয়জন লিখেছেন? কয়জন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে একটি দিনব্যাপী 'রাজাদিবস' কিংবা একটি বিশেষ 'রাজাসন্ধ্যা'র আয়োজন করেছেন? তাঁর অনন্য সাহিত্যকীর্তি নিয়ে জীবদ্দশায় কোনো বিশেষ 'রাজাসংখ্যা' বা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? এই উদাসীনতা কোনো একক ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সংস্কৃতির একটি বড় ক্ষত। আমরা গুণীকে তাঁর জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করি, অথচ তাঁর মৃত্যুর পর শোকের সাগরে ভাসতে ভালোবাসি। এটি শ্রদ্ধার এক চরম দুর্ভিক্ষ ছাড়া আর কিছুই নয়।
মরণোত্তর আড়ম্বর: একটি আত্মজিজ্ঞাসা এখন ড. তসিক ইসলাম রাজা আর আমাদের মাঝে নেই। এখন স্বাভাবিকভাবেই চারদিকে নানা আয়োজন শুরু হবে: বড় বড় হলরুমে স্মরণসভার আয়োজন। পত্র-পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ। তাঁর স্মৃতিচারণ করে আবেগী বক্তৃতা। কিন্তু এই সব আয়োজন কি সেই মানুষটির কাছে পৌঁছাবে? বেঁচে থাকতে যে মানুষটি একটু মূল্যায়ন, একটু স্বীকৃতি কিংবা তাঁর কাজ নিয়ে সুস্থ আলোচনার অধিকার রাখতেন, তাঁর চলে যাওয়ার পর এই আড়ম্বর মূলত আমাদের নিজেদের অপরাধবোধ ঢাকার চেষ্টা মাত্র।
উপসংহার ড. তসিক ইসলাম রাজা-র মতো একজন ব্যক্তিত্বের প্রস্থান আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর এই বিদায় যেন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে যায়। আসুন, গুণী মানুষকে আমরা তাঁদের জীবদ্দশায় সম্মান জানাতে শিখি। তাঁদের কর্মের মূল্যায়ন যেন মৃত্যুর পর কোনো স্মরণসভার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বেঁচে থাকতেই যেন তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন যে এই সমাজ তাঁদের ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। ড. তসিক ইসলাম রাজা তাঁর কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে চিরকাল রাজশাহীবাসী তথা সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা!....#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর