____ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: মানুষ সামাজিক জীব, আর সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সুন্দর আচরণ। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—প্রয়োজনের সময় মানুষের কণ্ঠস্বর মধুমাখা হয়ে ওঠে, কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে সেই মানুষটিই হয়ে যায় অচেনা। আচার-ব্যবহারে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি হওয়া আজ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যেখানে সুআচরণ হওয়ার কথা ছিল একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, সেখানে তা আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে 'স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার'।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন এই পরিবর্তন? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় 'ইউটিলিটারিয়ান রিলেশনশিপ' বা উপযোগবাদী সম্পর্ক বলা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি অন্যকে মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে, তখন তার আচরণে কৃত্রিমতা চলে আসে।
কগনিটিভ ডিসোনেন্স: মানুষ যখন নিজের স্বার্থের জন্য অভিনয় করে, তখন তার মস্তিষ্ক ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকে। কাজ উদ্ধার হয়ে গেলে সে সেই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত তার আসল বা রুক্ষ স্বভাবে ফিরে যায়।
সহানুভূতির অভাব: আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা মানুষকে অন্যের আবেগ বুঝতে বাধা দেয়। ফলে প্রয়োজন শেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে তারা দূরত্ব বজায় রাখাকেই সহজ মনে করে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: চীন ও জাপানের উদাহরণ চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো আজ বিশ্বে সমাদৃত কেবল তাদের প্রযুক্তির জন্য নয়, বরং তাদের শিষ্টাচারের জন্য। জাপানে একে বলা হয় 'ওমোতেনাশি' (Omotenashi)—অর্থাৎ কোনো প্রতিদানের আশা না করেই অতিথি বা অন্য মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন। জাপানে বিনয়কে শক্তির লক্ষণ মনে করা হয়, দুর্বলতা নয়। চীনে কনফুসিয়াসবাদের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল, যা শেখায় যে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখাই হলো একজন প্রকৃত মানুষের পরিচয়। আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব দেশে সামাজিক পুঁজি (Social Capital) বা পারস্পরিক বিশ্বাস বেশি, সেসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিও বেশি স্থিতিশীল। ধর্মীয় চিন্তাধারা ও মানবিক মূল্যবোধ পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই নিরবচ্ছিন্ন সুন্দর আচরণের তাগিদ দিয়েছে।
ইসলাম ধর্মে: বিদায় হজের ভাষণে এবং অসংখ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বোত্তম চরিত্রের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বলা হয়েছে, "মুমিনের পাল্লায় সুন্দর আচরণের চেয়ে ভারী আর কিছু নেই।" এখানে স্বার্থের বিনিময়ে আচরণের কোনো স্থান নেই।
অন্যান্য ধর্ম: সনাতন ধর্মে 'অহিংসা' ও 'পরোপকার'কে পরম ধর্ম বলা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মে 'করুণা' বা দয়া হলো নির্বাণ লাভের পথ। ধর্ম আমাদের শেখায় যে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা কোনো লেনদেন নয়, বরং এটি একটি ইবাদত বা আধ্যাত্মিক সাধনা। আমাদের দেশে দুষ্প্রাপ্যতার কারণ ও উত্তরণ আমাদের দেশে শৈশব থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে অনেক সময় 'যেকোনো মূল্যে জয়ী হওয়া'র মানসিকতা তৈরি হয়। ফলে সুআচরণকে আমরা অনেক সময় কেবল উদ্দেশ্য হাসিলের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। নীতিবিদ্যার চর্চা কেবল বইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।
উপসংহার মানুষের পরিচয় তার স্বার্থে নয়, তার ব্যবহারে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও সৌজন্যবোধ টিকে থাকাই হলো প্রকৃত মানবিকতা। আমরা যদি চীন বা জাপানের মতো মানবিক আচরণের উৎকর্ষ অর্জন করতে চাই, তবে আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুন্দর ব্যবহারের জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একটি বিশাল হৃদয়ের। মানুষের কাছে মানুষের প্রত্যাশা হোক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অকৃত্রিম সম্মান। তবেই আমরা একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারব!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক