ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা : মানবজাতির ইতিহাসে সুখ (Happiness) এক চিরন্তন অন্বেষণ। পশ্চিমা দর্শন যেখানে সুখকে প্রায়শই জাগতিক অর্জন, ইন্দ্রিয়সুখ (Hedonism) বা যুক্তিসঙ্গত ভালো জীবন (Eudaimonia) এর সাথে যুক্ত করে, সেখানে পবিত্র কুরআন এবং অন্যান্য বিশ্বধর্মগুলো সুখের এক গভীর আধ্যাত্মিক মাত্রা তুলে ধরে। কুরআনে সরাসরি 'সুখ' (Sa'āda/Hana') শব্দের ব্যবহার সীমিত হলেও, এর মূল বার্তা হলো— জাগতিক প্রাচুর্য নয়, বরং আত্মিক প্রশান্তি ('সাকিনা') ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত সন্তুষ্টি ('রিজা' ও 'কানায়া')-ই হলো জীবনের পরম লক্ষ্য এবং প্রকৃত সুখের মূল চাবিকাঠি। আলোচ্য নিবন্ধে কুরআনের এই মৌলিক ধারণার ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য প্রধান ধর্মগুলোর সাথে এর সাদৃশ্য তুলে ধরা হলো।
ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সুখের উৎস ও প্রকৃতি ইসলামী ধর্মতত্ত্বে সুখের ধারণার ভিত্তি হলো স্রষ্টা-সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক এবং জীবন ও মৃত্যুর উদ্দেশ্য। ১. 'সাকিনা' (প্রশান্তি) ও আল্লাহর স্মরণ: কুরআন অনুসারে, মানব মন স্বভাবতই অস্থির এবং একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই সেই অস্থিরতা দূর হয়। এটি কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যা ইবাদত ও ঈমানের মাধ্যমে লাভ করা যায়।
রেফারেন্স: "যারা বিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো, অন্তর আল্লাহর স্মরণেই প্রশান্তি লাভ করে।" (সূরা আর-রা'দ, ১৩:২৮)।
২. 'রিজা' (আল্লাহর সন্তুষ্টি) ও চূড়ান্ত গন্তব্য: দুনিয়ার জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর 'রিজা' বা সন্তুষ্টি অর্জন করা। এই সন্তুষ্টি অর্জনকারী বান্দাদেরই জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা চূড়ান্ত সুখের স্থান। ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে, সুখ একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ফলাফল, যা সৎকর্ম ও আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
রেফারেন্স: "আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত... এটাই হলো মহাসাফল্য।" (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:১১৯)।
৩. 'হায়াতান তাইয়্যিবাহ' (পবিত্র জীবন): ঈমানদারদের জন্য কুরআনে 'পবিত্র জীবন' বা 'উত্তম জীবন'-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই পবিত্র জীবন হলো অল্পে তুষ্টি, প্রশান্তি এবং জীবনে আল্লাহ কর্তৃক বরকত লাভের ফল, যা বোঝায় জাগতিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও মুমিনের জীবন অভ্যন্তরীণভাবে স্থির ও সুখী হতে পারে। রেফারেন্স: "যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে... অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব..." (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯৭)।
দার্শনিক বিশ্লেষণ: আত্মতুষ্টি ও প্রত্যাশার সীমা কুরআনের এই ধারণাগুলো মানুষের অসীম চাহিদা ও পার্থিব সুখের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির বিপরীতে এক গভীর দার্শনিক অবস্থান তৈরি করে।
১. 'কানায়া' (অল্পে তুষ্টি) বনাম ভোগবাদ: কুরআনের 'সন্তুষ্টি'র শিক্ষা ভোগবাদী ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। অল্পে তুষ্টি হলো এক প্রকার মানসিক মুক্তি—যা মানুষের প্রত্যাশার পরিধিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং না-পাওয়ার বেদনা থেকে মুক্ত রাখে। এটি অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার (Internal Freedom) একটি রূপ।
হাদিসের আলোক: রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছে, যাকে প্রয়োজন মাফিক রিজিক প্রদান করা হয়েছে এবং যে তাতেই পরিতুষ্ট (কানায়া) থাকে, সে-ই সফলকাম হয়েছে।" (ইবনে মাজাহ: ৪১৩৮)।
২. অস্থায়ী বনাম স্থায়ী সুখের দ্বান্দ্বিকতা: কুরআন জাগতিক ক্ষণস্থায়ী 'আনন্দ' (Pleasure) থেকে স্থায়ী আধ্যাত্মিক 'সুখ' (Happiness)-এর মধ্যে পার্থক্য করে। আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে অর্জিত সুখ চিরন্তন, যা বস্তুজগতের নির্ভরতা থেকে মুক্ত।
৩. নিয়তি ও স্থিরতা: তাকদীরের (ঐশ্বরিক নিয়তি) ওপর বিশ্বাস মানুষকে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে স্থিরতা দান করে। এই গ্রহণের মনোভাব (Acceptance) এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা)-ই এক গভীর আত্মিক সুখের জন্ম দেয়, যা বাহ্যিক ঘটনার দ্বারা সহজে টলে না।
অন্যান্য ধর্মের সাথে সুখের দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য কুরআনের এই আত্মিক সুখের ধারণা অন্যান্য প্রধান বিশ্বধর্মের মৌলিক শিক্ষার সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই সাদৃশ্যগুলোই প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আত্মিক মুক্তি লাভই প্রকৃত সুখের মূল চাবিকাঠি।
১. বৌদ্ধধর্ম ও নিবৃত্তি: বৌদ্ধধর্মে চরম সুখের লক্ষ্য হলো 'নির্বাণ' লাভ। নির্বাণ হলো জাগতিক বাসনা ও লোভের (Tanha) বিনাশের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি। ইসলামের 'কানায়া' (অল্পে তুষ্টি) এবং জাগতিক মোহ ত্যাগের ধারণার সাথে এর গভীর মিল রয়েছে। উভয় মতবাদই বাহ্যিক ভোগের ক্ষণস্থায়ীত্বকে প্রত্যাখ্যান করে।
২. হিন্দুধর্ম ও মোক্ষ/আনন্দ: হিন্দু দর্শনে জীবনের পরম লক্ষ্য হলো 'মোক্ষ' বা মুক্তি এবং 'আনন্দ' (পরম সুখ)। এটি জাগতিক কর্মফলের বন্ধন থেকে আত্মার মুক্তি লাভের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা ব্রহ্ম বা চূড়ান্ত সত্যের সাথে মিলনের ইঙ্গিত দেয়। কুরআনের 'রিজা' বা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে জান্নাত লাভের ধারণার সাথে এর আধ্যাত্মিক গন্তব্যের সাদৃশ্য বিদ্যমান।
৩. খ্রিস্টধর্ম ও ঐশ্বরিক সৌভাগ্য: যিশুর পর্বতের উপদেশে বর্ণিত 'Beatitudes' (পরম সৌভাগ্য) হলো সেই আধ্যাত্মিক গুণাবলী, যা ঈশ্বরের রাজ্যে পরম সুখ নিয়ে আসে। দরিদ্রতা, নম্রতা এবং ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের উপর জোর দেওয়ায় তা কুরআনের 'তাওয়াক্কুল' (আল্লাহর উপর ভরসা) এবং 'সাকিনা' (অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি)-এর ধারণাকে প্রতিফলিত করে।
উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, পবিত্র কুরআন মানবজাতির চিরায়ত সুখের অনুসন্ধানকে জাগতিক ভোগের ক্ষণস্থায়ী ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে এনে এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি শেখায় যে, সত্যিকারের সুখ নিহিত আছে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত সন্তুষ্টি ('রিজা'), আত্মিক প্রশান্তি ('সাকিনা') এবং অল্পে তুষ্টি ('কানায়া')-এর মধ্যে। এই ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক অবস্থান কেবল মুমিনদেরকেই জীবনের সকল উত্থান-পতনে স্থিরতা দেয় না, বরং অন্যান্য বিশ্বধর্মের মৌলিক আত্মিক শিক্ষার সাথে একটি সেতুবন্ধনও তৈরি করে। জাগতিক সম্পদের পেছনে না ছুটে, স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত এই মুক্তিই হলো মানুষের জন্য পরম সুখ এবং জীবনের চূড়ান্ত মহাসাফল্য!
শিক্ষার সাথে একটি সেতুবন্ধনও তৈরি করে। জাগতিক সম্পদের পেছনে না ছুটে, স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত এই মুক্তিই হলো মানুষের জন্য পরম সুখ এবং জীবনের চূড়ান্ত মহাসাফল্য!....#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর